ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জের এক বিত্তবান লোকের পরিচয় এখন ডিমবাবু। এই ডিমের কারবার করে তিনি কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। এমনকি কালীগঞ্জ শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। যেখানে বাণিজ্যিক স্পেস থেকে আবাসিক সব ধরনের ফ্লাট রয়েছে যা অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধার নিশ্চয়তা রয়েছে।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে গড়ে ওঠা এই ভবনটির মালিক মূলত ডিমের কারবারি। তার লাভের খতিয়ান থেকে স্পষ্ট তিনি এই ব্যবসাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। তার আর্থিক উন্নতি ঘটলেও ভোক্তা আর উৎপাদকদের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। এমনকি সাধারণ মানুষ বাড়তি দাম দিয়ে ডিম কিনতে যেয়ে নিঃস্ব হয়েছে। এই চিত্র কেবল একটি উপজেলার নয় দেশের অনেক এলাকায় এমন ডিম চক্র রয়েছে যাদের কাজই হচ্ছে গরীবের রক্ত চুষে নিজেদের বিত্ত বৈভব বাড়ানো।
নাহলে বাজারে কেন ডিম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে? এদিকে রাজধানীতে চড়া দামে ডিম বিক্রি হওয়ায় কম আয়ের মানুষের কাছে ডিম এখন বিলাসী খাদ্যে পরিণত হয়েছে। এক সময় মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে স্বল্প আয়ের পরিবারের খাবারের তালিকায় নিয়মিত জায়গা পেত ডিম। কিন্তু সেই ডিমের দামও বাড়তি। এতে চাপ পড়ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার আর বাড়ছে তাদের খাদ্যব্যয়। এদিকে, দাম বাড়লেও উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের সমন্বয় করতে পারছেন না খামারিরা। তাদের অভিযোগ, ডিমের বাজারে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্ষুদ্র খামারিরা।
দুই মাসের অনিন্ত্রিত ডিমের বাজার: গত দুই মাস ধরেই ডিমের বাজার অশান্ত। লাফিলে লাফিয়ে দাম বাড়ছে আর বাড়ানো হচ্ছে। একটি ডিমের দাম ১৫ টাকায় ঠেকেছে। বর্তমানে বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম। যা চলতি মাসের শুরুতে ক্রেতাদের কিনতে হয়েছে সর্বোচ্চ দামে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের শুরুতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ডিমের দাম বেড়েছিল সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ ডজনপ্রতি ক্রেতাদের বাড়তি গুণতে হয়েছে ১৫ টাকারও বেশি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ১ অক্টোবর প্রতি ডজন ডিমের সর্বোচ্চ দাম ছিল ১৬৫ টাকা। খুচরা বাজারে তা ১৮০ টাকাতেও বিক্রি হয়েছে। যদিও বর্তমানে দাম কিছুটা কমে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬২ টাকায়। দামের এই ওঠানামায় চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
চার সদস্যের একটি পরিবারে প্রত্যেকে প্রতিদিন একটি করে ডিম খেলে মাসে প্রয়োজন হয় ১২০টি। ডজনপ্রতি ১৬২ টাকা হিসাবে পরিবারটির শুধু ডিম কিনতে ব্যয় হয় ১ হাজার ৬২০ টাকা। ডজন ১৫০ টাকা থাকলে একই পরিমাণ ডিম কিনতে খরচ হতো ১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ মাসে বাড়তি ব্যয় ১২০ টাকা। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই বাড়তি খরচও কম নয়। রাজধানীর মধুবাগ এলাকায় বাস করেন বেসরকারি চাকরিজীবী হারুন অর রশীদ। তার এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটি প্রাথমিকে পড়ে। তার মেধা বিকাশে প্রয়োজন ডিম। কিন্তু মেয়ের সেই চাহিদা সে পূরণ করতে যেয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। চার সদস্যের পরিবারের জন্য একবেলা ডিমের প্রয়োজন চারটি। যার দাম কখনো পঞ্চাশ আবার কখনো ষাট টাকা। এদিকে দুই ছেলে মেয়ের জন্য প্রতিদিন দুটি ডিমের প্রয়োজন হলেও দাম বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত তা কিনতে পারছেন না।
হারুণ বলেন, আমরা বাবা-মা না খেলেও সন্তানদের খাওয়াতে হয়। কিন্তু এখন দাম বাড়ায় নিয়মিত ডিম খাওয়ানোর সুযোগ নেই। এক দিন বা দুই দিন পরপর খাওয়াতে হয়। নিজের বেতন বিষয়ে তিনি জানান, যে মাইনা পাই তা থেকে ঘরভাড়া পরিবহন ভাড়া, গ্যাস বিদ্যুৎ পানি বিল দিয়ে হাতে খুব বেশি অর্থ থাকে না। প্রতিদিন তাই সংসারের বাড়তি খরচ মেটাতে রাইড শেয়ার করি। কিন্তু সেখানেও আয় নেই। নিজের অফিস রয়েছে তাই সড়কে এক দুই ঘণ্টার বেশি সময় দিতে পারি না। রাইড শেয়ার করে কোনো দিন পাঁচশ আবার বেশিরভাগ দিনই তিনশ টাকা আয় হয়। বাড়তি জ্বালানির কারণে, তার অধিকাংশই ব্যয় হয়ে যায়।
একই চিত্র রিকশাচালক হোসেন আলীর পরিবারে। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যাত্রাবাড়ির এক বস্তিতে কম ভাড়ায় থাকেন। আগে সপ্তাহে অন্তত এক ডজন, কখনো দুই ডজন ডিম কিনতেন। এখন দামের কারণে সপ্তাহে দুই হালির মতো ডিম কিনতে পারছেন।
হোসেন আলি বলেন, আগে ডিমসহ অন্য জিনিসের দামও কম ছিল। কিন্তু এই এক মাস ধরে ডিম কেনা কমিয়ে দিয়েছি। দামের কারণে পরিবারে ডিম খাওয়াও কমে গেছে। রাজধানীর রামপুরার সততা রাইস অ্যান্ড গ্রোসারিতে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছিল ১৬০ টাকায়। দোকানটির বিক্রেতা দ্বীন ইসলাম জানান, তিনি এক ডজন কিনেছেন ১৫০ টাকায়। তার দাবি, এই দামে বিক্রি করে এক টাকাও লাভ হচ্ছে না। তবে দোকান পরিচালনা, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিয়ে প্রকৃত মুনাফা কত থাকছে, তা তার বক্তব্যে স্পষ্ট নয়। এদিকে, রামপুরায় স্বপ্ন সুপার শপের বিভিন্ন আউটলেটে দেখা গেছে, প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা দরে, অর্থাৎ ডজন ১৫৬ টাকা।
সিন্ডিকেটের দায় : ডিমের বাজারে অস্থিরতার পেছনে কয়েকটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে অভিযোগ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তার দাবি, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ডিমের দাম নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করছে। আগের দিন এসএমএসের মাধ্যমে দাম ঠিক করা হয়, যা পরদিন বাজারে কার্যকর হয় বলে অভিযোগ তার।
সফিকুজ্জামানের ভাষ্য, কাজী ফার্মস, নারিশসহ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মুরগির বাচ্চা, পোলট্রি খাদ্য ও ভ্যাকসিনের বাজারে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। এসব উপকরণের জন্য বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র খামারিরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে তদারকি জোরদার, মজুত ও কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ক্যাব সভাপতি। বাজারে কারসাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান জানতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দাম বাড়লেও লাভের নিশ্চয়তা নেই খামারির : চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খামারি মো. ইকবাল প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ডিম উৎপাদন করেন। গত শুক্রবার তিনি প্রতিটি ডিম পাইকারিতে সাড়ে ১০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। সে হিসাবে ডজনপ্রতি বিক্রয়মূল্য ১২৬ টাকা। ইকবাল বলেন, বাজারে ক্রেতাদের বেশি দামে কিনতে হলেও সেই লাভের ভাগ পুরোপুরি আমরা পাই না।
আমাদের প্রতিটি ডিম উৎপাদনে খরচ ১১ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪ টাকায়। ময়মনসিংহের ভালুকার খামারি মো. সুমনের অভিযোগ, মুরগির বাচ্চা সংগ্রহ থেকে শুরু করে খাদ্য কেনা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি খামারিরা বড় কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল। বাচ্চা কিনতে গেলে কখনো সংকট দেখা দেয়। আবার কোনো কোনো কোম্পানি থেকে বাচ্চা কিনলে তাদের উৎপাদিত খাদ্যও কিনতে হয়। খাদ্যের দাম বেশি বা মান খারাপ হলেও বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না বলে দাবি তার।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, গত বছর ডিমের দাম কম থাকলেও পোলট্রি খাদ্য ও উৎপাদন খরচ কমেনি। বড় ব্যবসায়ীরা সাময়িক লোকসান দিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন করে তোলেন। পরে বাজারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হলে দাম বাড়ান—এমন অভিযোগ তার। সুমন হাওলাদারের দাবি, বড় কোম্পানিগুলোর প্রভাবে তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি পরিচালিত হয়। সমিতি প্রতিদিন এসএমএসের মাধ্যমে ডিমের দাম ঘোষণা করে, যা বাজারে প্রভাব ফেলে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি পোলট্রি খাদ্য, মুরগির বাচ্চা ও ভ্যাকসিনের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন খরচের সঙ্গে ১০ শতাংশ মুনাফা যুক্ত করে খামার পর্যায়ে ডিমের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণের দাবি জানান। এদিকে, ডিমের বাজারে অস্বাভাবিক মুনাফা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি না করার আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে ডিম ও পোলট্রি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
বিআলো/অর্নব