আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মো. মাহফুজার রহমানকে হুমকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ এবং গ্রামের বাড়িতে লোক পাঠিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে মো. শাহ সুলতান নয়নের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর আবেদন করেছেন সাংবাদিক মাহফুজার রহমান। তিনি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
আর্থিক লেনদেন ঘিরে বিরোধ
সাংবাদিক মাহফুজার রহমানের অভিযোগ, মো. শাহ সুলতান নয়ন তাঁর পূর্বপরিচিত। ফ্ল্যাট কেনাবেচা ও প্লটের শেয়ারসংক্রান্ত লেনদেনের সূত্র ধরে তাঁদের মধ্যে আর্থিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট দুটি শেয়ারের আনুমানিক মূল্য ছিল ১৫ লাখ টাকা। এ-সংক্রান্ত লেনদেনে ২০২৫ সালে ৬ লাখ টাকা এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আরও ৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত সমস্যার কথা জানিয়ে নয়ন তাঁর কাছ থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাহফুজার রহমানের দাবি, পরবর্তীতে আর্থিক লেনদেন ও পাওনা-দেনা নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে তাঁকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় এবং জমি রেজিস্ট্রি না নিয়ে উল্টো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন নয়ন।
র্যাবের পরিচয়ে ফোন দেওয়ার অভিযোগ
মাহফুজার রহমানের অভিযোগ, আবদুল হালিম নামের এক ব্যক্তিগত নম্বর থেকে তাঁকে ফোন করে নিজেকে র্যাবের সদস্য বা র্যাব-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।
তবে ওই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় কিংবা র্যাবের সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফোন নম্বরটির ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন, এরপর বাড়ি দখলের হুমকি
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এসআই জিল্লুর, উত্তরা পশ্চিম থানার নাম উল্লেখ করে একজন ব্যক্তি মাহফুজার রহমানকে ফোন করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার কথা জানান। এর দুই থেকে তিন দিন পর গাইবান্ধায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে কয়েকজন ব্যক্তি গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাহফুজার রহমানের দাবি, ওই ব্যক্তিরা টাকা না দিলে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া এবং বাড়িঘর দখল করে নেওয়ার হুমকি দেন। এতে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
তবে হুমকি প্রদানকারীদের পরিচয় এবং তাঁদের সঙ্গে অভিযুক্ত নয়নের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক মাহফুজার রহমান।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
মাহফুজার রহমানের অভিযোগ, মো. শাহ সুলতান নয়ন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির সক্রিয় কর্মী ছিলেন এবং গাইবান্ধার একটি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে সাংস্কৃতিক ও আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর আরও অভিযোগ, নয়ন নিজের প্রভাব খাটিয়ে পুলিশি ক্ষমতার ভয় দেখান এবং বিভিন্নভাবে হয়রানির চেষ্টা করেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক পদ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
গণমাধ্যমে কথা বলার সময় হুমকির অভিযোগ
মাহফুজার রহমানের দাবি, বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে নয়নের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
ইমপালস ক্লিনিকের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের সামনে অবস্থিত ইমপালস ক্লিনিকের বৈধতা ও কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মাহফুজার রহমান। তাঁর অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ও কার্যক্রম সম্পর্কে অনুসন্ধান প্রয়োজন এবং স্থানীয় কয়েকজনের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
তবে ক্লিনিকটির লাইসেন্স, নিবন্ধন, অনুমোদিত সেবার পরিধি কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র পরীক্ষা করা জরুরি।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ক্লিনিকটির লাইসেন্স, নিবন্ধন ও কার্যক্রমের বৈধতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি
সাংবাদিক মাহফুজার রহমান জানিয়েছেন, তিনি কোনো প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা চান না; বরং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা এবং আইনের আশ্রয় চান।
আইজিপি বরাবর আবেদনে তিনি সংশ্লিষ্ট ফোনকলের তথ্য, আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র, সম্ভাব্য সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয় তদন্তের দাবি রাখে—সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা, র্যাবের পরিচয় ব্যবহার করে ফোন দেওয়া ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয়, গ্রামের বাড়িতে হুমকির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং ইমপালস ক্লিনিকের বৈধতা যাচাই।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা জরুরি। তদন্তে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
