অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধযুক্ত হলেও নাইট সয়েল সংগ্রহের ব্যবসাটি ছিল বেশ লাভজনক। যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোয় এ কাজে শত শত মানুষ নিয়োজিত ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসী। তারা নিজস্ব উদ্যোগে অথবা সিটি কন্ট্রাক্টরদের অধীনে কাজ করতেন।
১৮৭৩ সালের গ্রীষ্মের একদিন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের সিক্সথ এভিনিউয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি খোলা ঠেলাগাড়ি। সেটি কানায় কানায় ভর্তি মানুষের মলমূত্রে। গাড়ির ওপর কোনো ঢাকনা নেই। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ। পথচারীরা নাক চেপে দ্রুত সরে যাচ্ছেন, কেউ কেউ আবার বমি ভাব সামলাতে পারছেন না। গাড়ির পাশ বেয়ে বর্জ্য গড়িয়ে পড়ছে ফুটপাত ও নালায়। কয়েক ব্লক দূর থেকেও পাওয়া যাচ্ছে সে দুর্গন্ধ। শহরে তখনো আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে এমন দৃশ্য তখন ছিল স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ।
আজকের শহরে শৌচাগার ব্যবহার শেষে মলমূত্র কোথায় যায়, তা নিয়ে আমাদের খুব বেশি ভাবতে হয় না। কিন্তু উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি ছিল অনেক বড় একটি সমস্যা। বাড়ির উঠানে মাটির গভীরে গর্ত খুঁড়ে তৈরি করা হতো শৌচাগার। সেখানেই জমত পরিবারের সবার বর্জ্য। গর্তের ধারণক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে ডাক পড়ত বিশেষ একদল শ্রমিকের। রাতের অন্ধকারে তারা এসে সে বর্জ্য তুলে নিয়ে যেতেন। তারা পরিচিত ছিলেন ‘নাইট সয়েল ম্যান’ নামে। বাংলায় বলা যায়, ‘মলমূত্র অপসারণকর্মী’ কিংবা আরো সহজভাবে বলতে গেলে সবাই তাদের ‘মেথর’ নামে চেনে।
অন্ধকারে চলত বর্জ্য অপসারণের কাজ
মানুষের মলমূত্রকে ইংরেজিতে ভদ্রভাবে ‘নাইট সয়েল’ বলা হয়। নামটির পেছনেও আছে সামাজিক অস্বস্তি। দিনের আলোয় নিজেদের বর্জ্য সরানোর দৃশ্য দেখতে চাইত না ভদ্রসমাজ। তাই রাতের আঁধারে শ্রমিকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শৌচাগারের গর্ত পরিষ্কার করতেন। কাজ শেষে বর্জ্যভর্তি গাড়ি নিয়ে ছুটতেন শহরের রাস্তা ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে প্রতি বছর হাজার হাজার গাড়ি এভাবেই রাতের রাস্তায় চলত।
উনিশ শতকে শহরগুলো দ্রুত বড় হচ্ছিল, বাড়ছিল জনসংখ্যা ও ঘনবসতি। কিন্তু মানুষের বর্জ্য সামাল দেয়ার মতো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। এর মাঝে নিউইয়র্ক ছিল সবচেয়ে নোংরা শহরগুলোর একটি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর লন্ডনের একজন নাইট সয়েল ম্যানের কার্ড ছবি: অ্যাটলাস অবসকিউরা
১৮৪৪ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, শুধু ম্যানহাটনের বাসিন্দারাই বছরে প্রায় আট লাখ ঘনফুট মলমূত্র উৎপাদন করতেন। পরিমাণটি বোঝাতে বলা যায়, মাঝারি আকারের প্রায় ৫৩ হাজার গাড়ির ডিকি ভর্তি করার মতো বর্জ্য!
নদী, খাল এমনকি প্রেসিডেন্টের বাড়ির পাশেও বর্জ্য
নিউইয়র্কে সংগৃহীত বর্জ্যের কিছু অংশ শহরের বাইরের খামারে নিয়ে সার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তবে বেশির ভাগ সময় রাতের আঁধারে গাড়ি ভর্তি দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য নিয়ে যাওয়া হতো শহরের নির্দিষ্ট জেটিতে। সেখান থেকে সেগুলো সোজা ফেলে দেয়া হতো হাডসন কিংবা ইস্ট রিভারে। কখনো কখনো আবার এ বর্জ্যগুলো ভুল করে নিচে থাকা ব্যক্তিমালিকানাধীন নৌকার ওপরও পড়ে যেত। এতে নদীর তীরে বর্জ্যের বিশাল স্তূপ জমা হতো এবং পচে দুর্গন্ধ ছড়াত। পরে একটা সময় নদীর তীরে জমে থাকা বর্জ্যের কারণে জাহাজ ভেড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়লে শহরের কর্মীদের নির্দিষ্ট সময় পর পর পলি তোলার মতো করে বর্জ্য ছেঁকে তুলতে হতো।
ওয়াশিংটন ডিসিতে বর্জ্য ফেলার জন্য নির্ধারিত স্থানটি ছিল খোদ হোয়াইট হাউজের খুব কাছে একটি খোলা মাঠে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাকের ডগায়ই পচত শহরের বাসিন্দাদের ফেলা বর্জ্য। হোয়াইট হাউজের খাওয়ার পানির উৎসটি এ বর্জ্য ফেলার স্থান থেকে মাত্র সাত ব্লক ভাটিতে অবস্থিত ছিল। ধারণা করা হয়, ১৮৪১ সালে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসনের অকাল মৃত্যুর পেছনে এ দূষিত পানিও অন্যতম একটি কারণ ছিল। তবে এ সম্পর্ককে নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখানোর মতো তথ্য এখানে নেই।
দুর্গন্ধের আড়ালে জীবিকার লড়াই
অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধযুক্ত হলেও নাইট সয়েল সংগ্রহের ব্যবসাটি ছিল বেশ লাভজনক। যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোয় এ কাজে শত শত মানুষ নিয়োজিত ছিলেন। তাদের বেশির ভাগই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ ও অভিবাসী। তারা নিজস্ব উদ্যোগে অথবা সিটি কন্ট্রাক্টরদের অধীনে কাজ করতেন। সমাজে তাদের কাজকে প্রয়োজনীয় বলে স্বীকার করা হলেও দেখা হতো বিরক্তিকর উপদ্রব হিসেবে। রাতের বেলায় রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হওয়া ছিল তাদের জন্য নিত্যনৈমত্তিক ব্যপার। দুষ্কৃতকারীরা প্রায়ই তাদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ত এবং অনেক সময় তাদের ঘোড়াগুলোকে পর্যন্ত গুলি করত।
নিউ ইয়র্কের লোয়ার ইস্ট সাইড ছবি: লাইব্রেরি অব কংগ্রেস
কাজটি চূড়ান্ত রকমের নোংরা হলেও এতে আয়ের সুযোগ বেশ ভালো ছিল। লম্বা হাতলযুক্ত ডোবানো পাত্র বা বালতি দিয়ে শ্রমিকেরা গর্ত থেকে মলমূত্র তুলে গাড়ির ব্যারেল কিংবা ট্যাংকে ভরতেন। একটি সাধারণ শৌচাগারের গর্ত বছরে দুই-তিনবার খালি ও পরিষ্কার করতে হতো।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এসে ফ্লাশ টয়লেটের ব্যবহার শুরু হয়। তবে শহরগুলোয় পর্যাপ্ত সুয়ারেজ পাইপলাইন না থাকায় বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। ১৮৮০ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ফ্লাশ টয়লেটের বর্জ্য পেছনের উঠানের সেপটিক ট্যাংকে গিয়ে পড়ত। ফলে উপচে পড়া ঠেকাতে প্রতি ১০ দিন পর পর সেগুলো পরিষ্কার করতে হতো।
উঠানের গর্ত থেকে রাস্তায় নেমে আসত নোংরা স্রোত
উপচে পড়া শৌচাগারের দৃশ্য ছিল এক চরম বিভীষিকা। ১৮৮২ সালে নিউইয়র্কের রাস্তাঘাট নিয়ে লেখা এক বিবরণে জেমস ডি ম্যাককেব একটি বাড়ির উঠানের ভয়াবহ অবস্থা তুলে ধরেন। সেখানে শৌচাগারের বর্জ্য গড়িয়ে রাস্তার নালায় পড়ত। দৃশ্যটিকে তিনি তুলনা করেছিলেন ‘ক্ষুদ্র, ঘৃণ্য নায়াগ্রা জলপ্রপাতের’ সঙ্গে। তিনি লিখেছিলেন, এক ব্যক্তির বাড়ির উঠানের শৌচাগার উপচে সে বর্জ্য রাস্তার নর্দমায় গিয়ে পড়ছিল। তা দেখে মনে হচ্ছিল যেন আবর্জনার এক ক্ষুদে নায়াগ্রা জলপ্রপাত। ঘরের জানালা দিয়ে সে বিভৎস দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল এবং নিচে জমে থাকা ময়লার তীব্র দুর্গন্ধ সরাসরি ভেতরে প্রবেশ করছিল।
সমস্যাটি শুধু নাক-মুখ বন্ধ করে সহ্য করার মতো ছিল না। উপচে পড়া শৌচাগার ও ফুটো বর্জ্যগর্ত থেকে মলমূত্র মাটিতে মিশে যেত। দূষিত হতো আশপাশের কূপের পানি। ফলে কলেরার মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ত। উনিশ শতকে যুক্তরাষ্ট্রে বারবার কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ১৮৪৯ সালে কলেরার প্রাদুর্ভাবে শুধু নিউইয়র্ক শহরেই পাঁচ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
আধুনিক যন্ত্রেও সমস্যার সমাধান হয়নি
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শেষভাগে মানুষের বর্জ্যের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়। ফলে শহর কর্তৃপক্ষ নাইট সয়েল নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর কঠোর কড়াকড়ি আরোপ করে। যেসব কর্মী যত্রতত্র বা রাস্তায় বর্জ্য ফেলত, তাদের ওপর চড়া জরিমানা ধার্য করা হয়। এ সময় প্রযুক্তির ব্যবহারও কিছুটা স্বস্তি আনে।
বাল্টিমোরের একজন নাইট সয়েল ম্যান ছবি: অ্যাটলাস অবসকিউরা
১৮৭২ সালে নিউইয়র্ক কর্তৃপক্ষ ম্যানহাটন ওডারলেস এক্সকাভেটিং কোম্পানিকে বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব দেয়। প্রতিষ্ঠানটি আধুনিক পাম্প ও বায়ুরোধী ট্যাংক ব্যবহার করত। ফলে দিনের যেকোনো সময় বর্জ্য তোলার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু পুরনো কিছু শৌচাগারের গর্ত এতটাই জটিল ছিল যে সেগুলো হাতেই পরিষ্কার করতে হতো। শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে কিংবা উন্নত যন্ত্র এনেও শহরের বিপুল বর্জ্য সামাল দেয়া যাচ্ছিল না।
নর্দমা বদলে দিল শহরের জীবন
প্রযুক্তি ও কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ মানব বর্জ্যের সংকট সমাধান করা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। মার্কিন শহরগুলোকে এ অভিশাপ থেকে মুক্ত করার একটিই স্থায়ী উপায় ছিল, তা হলো আধুনিক সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক বা সমন্বিত নর্দমা ব্যবস্থা।
শেষ পর্যন্ত সমাধান এল পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার বিস্তারে। আঠারো শতকের মাঝামাঝি বিভিন্ন শহরে পৌর নর্দমা নির্মাণ শুরু হয়। শতকের শেষ দিকে এ কাজ দ্রুত এগোয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে নিউইয়র্ক ও ব্রুকলিনে ৮৪৪ মাইল, শিকাগোয় ৫২৫ মাইল ও ফিলাডেলফিয়ায় ৩৭৬ মাইল নর্দমা নির্মিত হয়েছিল।
এর প্রায় ২৫ বছর পর নিউইয়র্ক সিটি কর্তৃপক্ষ শৌচাগার পরিষ্কারের হিসাব রাখা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এভাবেই সমাপ্তি ঘটে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের এক অস্বাস্থ্যকর অধ্যায়ের এবং অবসান হয় নাইট সয়েল ম্যানদের যুগের।
আজকের শহুরে জীবনে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় অদৃশ্য এক অবকাঠামো। অথচ এর আগে শহরকে বাসযোগ্য রাখতে রাতের পর রাত কাজ করেছেন এমন শ্রমিকেরা, যাদের নাম ইতিহাসে খুব কমই জায়গা পেয়েছে। তাদের শ্রমের গল্প মনে করিয়ে দেয় আধুনিক নগরজীবনের স্বাচ্ছন্দ্যের পেছনে রয়েছে এমনসব কাজ, যেগুলো চোখে পড়ে না, অথচ থেমে গেলে পুরো শহরই বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
মাহফুজা মিম: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা
