এই সেদিন ধুমধাম করে নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন থাকার সিকি শতক উদ্যাপিত হল। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ১৩ বছর পর প্রধানমন্ত্রী হলেন। তারপর থেকে আরও ১২ বছর অতিক্রান্ত। এখনও তিনি প্রধানমন্ত্রী। তঁাকে দেখে বোঝা যায়,
ক্লান্তি-শ্রান্তিতে তিনি আচ্ছন্ন হন না। ‘পরাজয়’ শব্দটিও তঁার অভিধানে নেই– জয়ের আকাঙ্ক্ষা তঁার এতটাই। ফলে, ৩ বছর পর তঁারই নেতৃত্বে আরও ৫ বছর কীভাবে দেশের মাথা আরও উঁচু করা যায়– সেই চিন্তায় তঁার সমর্থক ও ভক্তকুল মশগুল। ৭৫ বছর বয়স হলে বানপ্রস্থে যাওয়ার একটা বিধান যে তিনিই চালু করেছিলেন, এখন আর কেউ তা মনেই করতে চায় না। ভক্তরা ভাবতেই পারে না, বিজেপিতে ‘মোদিহীন’ জীবন বলে কিছু থাকতে পারে– দল ও সরকারে নরেন্দ্র মোদির ছায়া এতটাই দীর্ঘ।
প্রধানমন্ত্রী হয়েও যে তিনি নিস্তরঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন তা নয়। নোটবন্দির মতো বেহিসেবি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রবল সমালোচিত হয়েছেন।
তবু কেন যেন মনে হচ্ছে, একরাশ উদ্বেগ আচমকা নরেন্দ্র মোদিকে গ্রাস করেছে। রাজনৈতিক ভাগ্য কিংবা কর্মফল এই গোধূলিবেলায় তঁাকে মোক্ষম পরীক্ষার সামনে দঁাড় করিয়েছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, সিকি শতকে যেসব পরীক্ষায় তঁাকে বসতে হয়েছে, এবারেরটা সেগুলির তুলনায় বেশি কঠিন। কঠিন, কেননা, এই প্রথম বিরোধীরা এক সুরে কথা বলছে। এই প্রথম সরকারের শরিকেরাও সেভাবে কোমর বেঁধে সমর্থনের ডালি নিয়ে পাশে দঁাড়াচ্ছে না। গলার রগ ফুলিয়ে কাউকে এখনও বলতে শোনা যায়নি, জ্ঞানেশ কুমার যা করেছেন তাতে চোরামির কিছু নেই। বেআইনিও নয়। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির নামে আগডুম বাগডুম লিখেছে। সোয়া ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়াটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, আদৌ ছকবাজি নয়।
এমন মনে হওয়া আগেও যে হয়নি তা নয়। কিন্তু প্রতিবারই ভোজবাজির মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে। মোদিও আবার হাসতে হাসতে ভিকট্রি স্ট্যান্ডে দঁাড়িয়েছেন। কেউ টলাতে পারেনি। প্রতিটি সংকট তঁাকে আরও বলিয়ান করেছে। ধরা-ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে গিয়েছে।
সেই প্রথমবার, ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর কেশুভাই প্যাটেলকে সরিয়ে মোদি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হন, ভুজের ভয়ংকর ভূমিকম্পের মোকাবিলা করাটাই ছিল তখন তঁার প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই কাজে ব্যর্থ হওয়ার দরুনই কেশুভাইকে সরে যেতে হয়েছিল। মোদি চ্যালেঞ্জটা শুধু গ্রহণই করেননি, পরের বছর ডিসেম্বরে বিধানসভার ভোটে দলকে তরিয়েও দিয়েছিলেন। সেই বছরেই ঘটেছিল গোধরা ও অবর্ণনীয় গুজরাত দাঙ্গা। বাজপেয়ীর রোষানলে যখন মোদির যাই-যাই হাল, সে-সময় মুশকিল আসান হয়ে দঁাড়িয়েছিলেন আদবানি। লৌহপুরুষের সাহচর্য পেয়ে আর তঁাকে পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘ম্যান ফ্রাইডে’ অমিত শাহকে নিয়ে উতরে গিয়েছেন সব পরীক্ষায়। মায় আদালতের পরীক্ষাতেও। ২০১৪ সালে কংগ্রেসের মোকাবিলায় আরএসএস এমনি-এমনি তঁাকে তুরুপের তাস হিসাবে ব্যবহার করেনি।
প্রধানমন্ত্রী হয়েও যে তিনি নিস্তরঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন তা নয়। নোটবন্দির মতো বেহিসেবি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রবল সমালোচিত হয়েছেন। সামলেও নিয়েছেন। আগুপিছু বিবেচনা না-করে জিএসটি চালুও ছিল চরম ঝুঁকির। কিন্তু দমেননি। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামা কাণ্ডে বিদ্ধ হয়েও হিন্দুত্ববাদের জিগির তুলে পাকিস্তানকে খাড়া করে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছেন। পরের বছর কোভিডের সামাল দিয়েছেন। তৃতীয় বিশ্বকে প্রতিষেধক দিয়ে ‘বিশ্বগুরু’ সাজতে চেয়েছেন। গালওয়ানে পা হড়কেছে। সবদিক থেকে হেরো প্রতিপন্ন হয়েও বিস্ময়করভাবে সামলে নিয়েছেন দলে কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ রেখে। কৃষক বিদ্রোহে বিপন্ন বোধ করেছেন। কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন। তবু আসন টলতে দেননি। ৪ শতাধিক এমপি নিয়ে রাজীব গান্ধী ৫ বছরেই মুখ থুবড়ে পড়েছেন, অথচ ৩ শতাধিক এমপির পাশাপাশি গোটা বিরোধী পক্ষকে টঁ্যাকে গুঁজে মোদি এই ৭৫-এও ‘গোয়িং স্ট্রং’। হারের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে কীভাবে ‘সিকন্দর’ সাজতে হয়, মোদি তার একমাত্র চলতা-ফিরতা বিজ্ঞাপন। কণ্টকাকীর্ণ পথকে কুসুমকোমল করে তোলার উত্তম নমুনা মোদি ছাড়া আর কাউকে ভাবা যায় না।
সুপ্রিম কোর্ট যা-ই বলুক, আন্দোলন যতই তীব্র হোক, জ্ঞানেশ নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অতীতের প্রতিটি সংকটের মতো এবারেও তিনি ‘জ্ঞানেশ’ নামের কঁাচা ঘুঁটি পাকা করে ঘরে তুলতে পারবেন কি না তা লাখ টাকার প্রশ্ন। এবারের চ্যালেঞ্জ অভিনব, কারণ, অভিযোগের তির যঁার বিরুদ্ধে তিনি এক সাংবিধানিক সংস্থার প্রধান, যঁার নিয়োগ পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আদালতের বিচারাধীন। তিন নির্বাচন কমিশনারকে আজীবন ‘ইমিউনিটি’ বা রক্ষাবকচ দেওয়ার বিষয়টিও সন্দেহজনক, বিতর্কিত এবং অভূতপূর্ব। যে রক্ষাকবচ রাষ্ট্রপতির নেই, প্রধানমন্ত্রীর নেই, প্রধান বিচারপতিরও নেই, সেই রক্ষাকবচ ইসি সদস্যদের দেওয়া কোন অপকর্মের হাত থেকে বঁাচানোর তাগিদে? জনমনকে এই প্রশ্ন তোলপাড় করছে বলেই দেশজুড়ে জ্ঞানেশ কুমার এই মুহূর্তে ভিলেন। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি ধুলোয় লুটোপাটি খাচ্ছে। আতসকাচের তলায় চলে এসেছে মোদি-শাহর ‘রাম-লক্ষ্মণ জুটি’, কেননা বিরোধীরা বুঝিয়ে দিয়েছে জ্ঞানেশ যন্ত্র, মোদি ও তঁার সুগ্রীব দোসর অমিত শাহ যন্ত্রী।
‘ইন্ডিয়া’ ক্রমে জোটবদ্ধ হচ্ছে।
মমতা, স্ট্যালিন, ঠাকরে ব্রাদার্স, শরদ পাওয়ার, তেজস্বীদের হীনবল হওয়া রাহুলের পক্ষে শাপে বর। ‘ইন্ডিয়া’-র নেতৃত্বপদ নিয়ে রাহুলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো শক্তি এই মুহূর্তে আর কারও নেই। অখিলেশ বুঝছেন, এবার নিশ্চিতভাবেই রাহুল উত্তরপ্রদেশে তঁাদের ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসাবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকলে ভোটের সময় কৌশলী হওয়া ছাড়া তাদের সমর্থকদের ভিন্ন উপায় নেই। তখন তাদের বলতেই হবে, যে যেখানে বিজেপিকে হারানোর মতো অবস্থায়, ‘বিকল্প’ হিসাবে তারা তাদেরই বেছে নিক। নরেন্দ্র মোদি আশার আলো দেখতে পারেন আরশোলারা দল গড়ে ভোটে লড়লে। বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগাভাগি হলেই তো তঁার পোয়াবারো।
সুপ্রিম কোর্ট যা-ই বলুক, আন্দোলন যতই তীব্র হোক, জ্ঞানেশ নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ধর্মেন্দ্র প্রধানের মতো তঁাকে পদত্যাগ করতে বলাও মোদির পক্ষে সম্ভবপর নয়। কেননা, তিনি ভালই জানেন, বিরোধীরাও বারবার বুঝিয়ে দিয়েছে, জ্ঞানেশ নিমিত্ত মাত্র। মূল লক্ষ্য: মোদি। সেই নিরিখে ২০২৭ সালের মার্চেই নরেন্দ্র মোদির প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। ওই মাসেই ঠিক হবে উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, গোয়া, মণিপুর ও উত্তরপ্রদেশের ভাগ্য।
রাষ্ট্রবাদ ও রাষ্ট্রবিরোধিতার সংজ্ঞা তাদের কাছে স্থূল ও ঠুনকো। প্রশ্ন করতে তারা ভয় পায় না। মন্দির-মসজিদের রাজনীতি তাদের কাছে অর্থহীন।
উত্তরাখণ্ড, গোয়া ও উত্তরপ্রদেশে পায়ের তলার মাটি সরে গেলে ডিসেম্বরে মোদি-শাহর খাসতালুক গুজরাত ধরে রাখা কঠিন হয়ে দঁাড়াবে। তখন ১০০০টা ছিদ্র সামনে আসবে। হাজারটা স্ফুলিঙ্গ দাবানল হওয়ার হুমকি দেবে। ডুবন্ত জাহাজে কেউ থাকতে চায় না।
মনে রাখতে হবে এই তথ্যও, এখন ভারতে জেন জি-র সংখ্যা ৪০ কোটি। ২০২৯ সালে এদের সঙ্গে কঁাধ মেলাবে আরও ৩৮ কোটি জেন আলফা। এই মুহূর্তের ট্রেন্ড দেখাচ্ছে, এই জনগোষ্ঠী হিন্দুস্তান-পাকিস্তানে ভোলে না। হিন্দুত্ববাদ তাদের কাছে অসাড়।
রাষ্ট্রবাদ ও রাষ্ট্রবিরোধিতার সংজ্ঞা তাদের কাছে স্থূল ও ঠুনকো। প্রশ্ন করতে তারা ভয় পায় না। মন্দির-মসজিদের রাজনীতি তাদের কাছে অর্থহীন। কিন্তু, এটাও সত্যি, সিকি শতক ধরে নরেন্দ্র মোদি অজেয়। ম্যাজিশিয়ানের মতো দেশবাসীকে তিনি মায়াজালে আচ্ছন্ন রেখেছেন। সাম-দাম-দণ্ড-ভেদের প্রকৃষ্ট প্রয়োগের নমুনা দিচ্ছেন বারবার। ‘নন-বায়োলজিকাল’, তাই হয়তো ভীষ্মের মতো ইচ্ছামৃত্যুর বরে তিনি বলীয়ান। কে বলতে পারে, দেখা গেল
কঠিনতম এই পরীক্ষাতেও তিনি হেলায় উতরে গেলেন!
(মতামত নিজস্ব)
[email protected]
