পদত্যাগ কিংবা ভবিষ্যতে আর কখনো চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ক্যাম্পাসে প্রবেশ না করার বিষয়ে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেননি বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় পদত্যাগ ও ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে তাঁকে মুক্ত করা হয়েছে বলে প্রকাশিত সংবাদকে অসত্য ও ভিত্তিহীন দাবি করেছেন তিনি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে পাঠানো এক প্রতিবাদলিপিতে উপাচার্য এসব কথা বলেন। একই দাবি করেছেন তাঁর সঙ্গে অবরুদ্ধ থেকে মুক্ত হওয়া চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ। কোনো মুচলেকা দেওয়া হয়ে থাকলে তার কপি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তাঁদের সর্বাত্মক শাটডাউন চলবে।
প্রতিবাদলিপিতে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানান, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে চুয়েটের প্রশাসনিক ভবনে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশের পর থেকে তিনি অবরুদ্ধ ছিলেন। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগবিহীন অবস্থায় থাকায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। একই সময়ে সেখানে অবস্থানরত আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর আগে অসুস্থ হয়ে পড়া দুজন অ্যালামনাই সদস্যের একজনকে হাসপাতালে নিতে হয়। পরে সরকারি চিকিৎসক ও চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের পরামর্শে তাঁকেও হাসপাতালে নেওয়া হয়।
উপাচার্য বলেন, ক্যাম্পাস থেকে বের করে নেওয়ার সময় তাঁর কথা বলার মতো শারীরিক অবস্থা ছিল না। ফলে তাঁর বক্তব্য না নিয়ে পদত্যাগ এবং ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তের কথা প্রচার করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিপন্থী। সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোকে তথ্য যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ এবং ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সংশোধনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র তাঁকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, তা পালন করতেই তিনি চট্টগ্রামে এসেছেন। তাঁর কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, বিশেষ এজেন্ডা কিংবা দলীয় উদ্দেশ্য নেই। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় যেন তাঁদের মূল্যবান শিক্ষাজীবন ও একাডেমিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিজের অ্যালামনাই ছোট ভাই-বোন হিসেবে বিবেচনা করেন। সুস্থ হয়ে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনে ফেরার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে এসেও একই বক্তব্য দেন উপাচার্য। তিনি বলেন, পদত্যাগ করেছেন কিংবা আর কখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন না— এমন কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি তিনি দেননি। অবরুদ্ধ অবস্থায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তির পর তাঁর উচ্চ রক্তচাপ ও বুকে অস্বস্তির কথা জানা যায়। চিকিৎসকদের পরামর্শে ইসিজি, ট্রোপোনিন-আইসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়।
চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সাত্তার জানান, উপাচার্যকে ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে এবং বিশ্রাম প্রয়োজন। চিকিৎসায় যাতে বিঘ্ন না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
গত সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে নিয়োগ পাওয়ার ২২তম দিনে চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। পরে শিক্ষার্থীদের লাগানো তালা ভেঙে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক নেতাসহ কয়েকজন ছিলেন। খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং দুপুর ১২টার মধ্যে তাঁকে কার্যালয় ছাড়ার আলটিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময়ে তিনি বের না হওয়ায় দুপুর পৌনে ১টার দিকে ভবনের সদর দরজা ও জরুরি প্রবেশপথে পুনরায় তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
অবরুদ্ধ অবস্থায় উপাচার্য ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের শুকনো খাবার ও পানি সরবরাহ করা হয়। এ সময় কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরদিন মঙ্গলবার উপাচার্যের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি উদ্ধারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। পরে বিকেল ৫টার দিকে চুয়েট ক্যাম্পাসে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
আলোচনায় শিক্ষার্থীরা তাঁদের বহনকারী বাসে হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি উপাচার্যের পদত্যাগ এবং তাঁর সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পুলিশ সুপার বলেন, অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে কারও বিরুদ্ধে চলমান মামলা থাকলে তাঁকে আটক করা হবে।
পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মধ্যস্থতায় উপাচার্যসহ অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের বের করে আনা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের উত্তর পাশের জরুরি প্রবেশপথ দিয়ে তাঁদের বের করা হয়। পরে পুলিশি পাহারায় অ্যাম্বুল্যান্সে করে উপাচার্যসহ অন্যদের চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
উপাচার্যের ক্যাম্পাস ত্যাগের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কয়েকজন দাবি করেন, তিনি আর চুয়েটে ফিরবেন না— এমন শর্তে তাঁকে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। চুয়েট যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাফ শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, জেলা প্রশাসকের মধ্যস্থতায় ওই শর্তে উপাচার্যকে বের করে নেওয়া হয়েছে। সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত শাটডাউন চলবে বলেও জানান তিনি। ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হিসাম বলেন, অধ্যাপক শরীফুল আলম আবার ক্যাম্পাসে ফিরলে তাঁরা আরও কঠোর আন্দোলনে যাবেন। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখছেন না তাঁরা।
অন্যদিকে, উপাচার্যের সঙ্গে অবরুদ্ধ থেকে মুক্ত হওয়া চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, অসুস্থতার কারণে উপাচার্য কোনো বক্তব্য দেননি। তাঁর পক্ষ থেকে কোনো লিখিত বক্তব্য বা মুচলেকাও দেওয়া হয়নি। এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের আগে প্রকৃত তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো মুচলেকার কপি থাকলে তা প্রকাশ করা হোক।
ওয়াসিফ রাশেদের দাবি, প্রজ্ঞাপন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম উপাচার্যের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরবেন বলে আশা প্রকাশ করেন ছাত্রদল সভাপতি। উপাচার্যের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের তা প্রত্যক্ষ করার ঘটনা কষ্টকর। তাঁর ভাষায়, ‘অন্যায় আবদার কখনো অধিকার হতে পারে না, যৌক্তিকও হতে পারে না।’
উল্লেখ্য, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব গ্রহণের ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরদিন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণে সর্বাত্মক শাটডাউন শুরু হয়। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালসহ বিভিন্ন দাবিতে তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শাটডাউনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম ও সেমিস্টার পরীক্ষা স্থবির হয়ে পড়েছে।
The post চুয়েট ভিসির পদত্যাগ নিয়ে ধোঁয়াশা, মুচলেকার কপি প্রকাশের দাবি appeared first on বাংলাধারা.
