রাশিয়ায় মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বেতনে বেকারিতে কাজ করতেন কুমিল্লার চান্দিনার যুবক মো. সাগর (২৪)। এরই মধ্যে এক বাংলাদেশি দালাল তাঁকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখান। সেই প্রলোভনে পড়ে বেকারির চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেন সাগর। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েছে পরিবার।
গত শনিবার রাশিয়ায় থাকা সাগরের এক বন্ধু তাঁর বোনের মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে জানান, ‘সাগর আর নেই।’ এ খবর শোনার পর মূর্ছা যান তাঁর মা। পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া।
সাগর কুমিল্লার চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার কবির হোসেনের ছেলে। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা সাগর প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। কিশোর বয়স থেকেই রিকশা-ভ্যান চালিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকটে সহায়তা করতেন। উপজেলা সদরের একটি রড-সিমেন্টের দোকানে পণ্য ভ্যানে বহন করার সুবাদে ওই দোকানের এক ম্যানেজারের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে বিদেশে গেলেও তাঁদের যোগাযোগ ছিল। পরে দেশে ফিরে আবারও একই দোকানে চাকরি নেন তিনি।
বন্ধুত্বের সুবাদে সাগরকে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন ওই ম্যানেজার। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর। সেখানে একটি বেকারিতে চাকরি নেন এবং মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করতেন।
এরপর রাশিয়ায় অবস্থানকালে এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে পরিচয় হয় সাগরের। ওই ব্যক্তি তাঁকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চাকরির প্রস্তাব দেন এবং এককালীন ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেন। দালালের কথায় বিশ্বাস করে চলতি বছরের মে মাসে বেকারির চাকরি ছেড়ে দেন সাগর। পরে তাঁকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করা হয় বলে দাবি পরিবারের।
সাগরের চাচা আব্দুল আওয়াল বলেন, “সাগর যখন বেকারির চাকরি ছেড়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা জানায়, তখন তাকে বারণ করেছিলাম। সে লেখাপড়া জানে না। বিদেশের সেনাবাহিনীতে কীভাবে চাকরি করবে, তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল। কিন্তু দালাল তাকে ভুল বুঝিয়ে যুদ্ধে নিয়ে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধে যাওয়ার আগে সাগর তার অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। গত শনিবার তার এক বন্ধু মেসেজ দিয়ে মৃত্যুর খবর জানিয়েছে। রাতে বিস্তারিত জানাবে বললেও রোববার রাত ৯টা পর্যন্ত আর ফোন করেনি। আমরাও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না।”
সাগরের বাবা কবির হোসেন বলেন, “সবজির ব্যবসা করেছি। দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে অসুস্থ। অনেক ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। চার-পাঁচ মাস ধরে ছেলের সঙ্গে কথাও বলতে পারিনি। এখন শুনি, আমার ছেলে আর নেই।”
এ কথা বলেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।
এ বিষয়ে চান্দিনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
