কুমিল্লায় জাতায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এখন চরমে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিবারের কাছে নেতৃত্ব জিম্মি হয়ে থাকা এবং একটি পক্ষের আধিপত্যকে টিকিয়ে রাখতে দলের দুই জনপ্রিয় নেতাকে জেলা থেকে কেন্দ্রে পাঠানোর পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে এ দ্বন্দ্ব আরও জোরালো হয়েছে। এ নিয়ে বুধবার রাতে দলীয় কার্যালয় এবং দলের সেক্রেটারির গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের নেতৃত্ব ও পদের বিন্যাস নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের মধ্যে মতবিরোধ চলে আসছিল। আসন্ন মহানগর জামায়াতের কমিটিতে নিজেদের পছন্দের নেতৃত্ব আনয়ন বা প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নেয়। এর জেরে বুধবার রাতে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
নেতাকর্মীরা জানান, কাজী দ্বীন মোহাম্মদ গত ৩০ বছর ধরে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি নতুন আমির নির্বাচনের জন্য দলীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মাঝে মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির মোসলেহ উদ্দিন এবং এমদাদুল হক মামুনকে দায়িত্ব পালনের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে তাদের দুজনের আমির হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর ফলে বর্তমান সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান সিনিয়র হিসেবে আলোচনায় চলে আসেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয় এমদাদুল হক মামুনের সমর্থকরা। তাদের ধারণা, মামুনকে কেন্দ্রে পাঠানোর পেছনে সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের হাত থাকতে পারে।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে বর্তমান আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, নায়েবে আমির মোসলেহ উদ্দিন ও এমদাদুল হক মামুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে চলে যাবেন— এমন গুঞ্জনে নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই তিন নেতা কেন্দ্রীয় কমিটিতে চলে গেলে এখানে আমির হতে পারেন বর্তমান সেক্রেটারি মাহাবুবুর রহমান। এমদাদুল হক মামুনের অনুসারীরা তাকে মহানগরীর আমির হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তাকে কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াটা মেনে নিচ্ছে না তার অনুসারীরা।
দলের একাধিক সূত্র জানায়, গত দুদিন ধরে মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে জিম্মি করে অন্যের জমি দখল ও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সমালোচনা হয়। অনেকে বলছেন, মাহাবুবুর রহমান আমির হলে দলে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এ নিয়ে দলে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে এমদাদুল হক মামুন এবং মাহবুবুর রহমান বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকে এড়িয়ে গেছেন। দুজনই ফোন রিসিভ করেননি।
এবি পার্টির জড়িত থাকার অভিযোগ : হামলা এবং ভাঙচুরের জন্য এবি পার্টি, (আমার বাংলাদেশ পার্টি) কুমিল্লা মহানগরীর আহ্বায়ক গোলাম মোহাম্মদ সামদানীকে দায়ী করা হয়েছে। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিবিরি নেতা ও এবি পার্টির কুমিল্লা জেলা আহ্বায়ক মিয়া মোহাম্মদ তৌফিক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কুমিল্লা মহানগরীর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এবি পার্টির কুমিল্লা মহানগরীর আহ্বায়ক গোলাম মোহাম্মদ সামদানীর সম্পৃক্ততার বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত নিউজ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এবি পার্টির সম্মানীত চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিষয়টি অবগত হয়েছেন। তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে দলীয় ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে তা উত্থাপন করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন।’ তৌফিক বলেন, জামায়াতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সৃষ্ট জটিলতায় এবি পার্টি কুমিল্লা মহানগর ও জেলা কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কেউ এমনটি করে থাকলে এবি পার্টি এর দায়ভার বহন করবে না।
অন্যদিকে ঘটনার পর মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সন্ধ্যা ৭টার দিকে দলীয় কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত সভা চলছিল। এ সময় কয়েকজন যুবক সভায় ঢুকে হইচই শুরু করেন। পরে হট্টগোল করে চলে যাওয়ার সময় তারা একটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। কারা এ ঘটনায় জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে জানতে পেরেছি। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত অভিযোগ করেননি।
ঘটনাটি দুর্ভাগ্যজনক, দাবি জামায়াতের : দীর্ঘদিন ধরে কঠোর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য পরিচিত জামায়াতে ইসলামী এখন শৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের নতুন আমির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। দলীয় কার্যালয়ের সামনে নেতার গাড়ি ভাঙচুর এবং অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনার ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়েছে দলটির নেতৃত্ব।
এ ঘটনায় দলের জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, ‘ঘটনাটি দুর্ভাগ্যজনক। এটা এত বড়ভাবে দেখার বিষয় নয়। তিনি বলেন, যে বা যারাই দোষী হবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা জানান তিনি।
