ময়মনসিংহের আনন্দমোহন সরকারি কলেজে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন লাইব্রেরি-কাম-অডিটোরিয়াম ভবনের নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার মেজবাহ উদ্দিন সজলকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তাঁকে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে দাবি করেছেন তিনি। এ ঘটনার পর দুই দিন বন্ধ ছিল নির্মাণকাজ। এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকেরা।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনতলাবিশিষ্ট লাইব্রেরি-কাম-অডিটোরিয়াম ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে। ২০২৭ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টিএই-বিবিসি-ডিসিএল (জেভি)। তবে কাজ করতে গিয়ে চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, গত ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় ৮ থেকে ১০ জন ব্যক্তি কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ম্যানেজার মেজবাহ উদ্দিন সজলকে হুমকি দিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যান। পরে তাঁকে মোটরসাইকেলে করে শহরের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়। এ সময় টাকা দাবি করা হয় এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে বলা হয়। অন্যথায় হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তাঁর।
মেজবাহ উদ্দিন সজল বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির শিকার আগে কখনো হইনি। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস থেকে আমাকে তুলে নিয়ে চাঁদা চাওয়া হয়েছে, বিষয়টি ভাবতেও অবাক লাগে। প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো হয়। যারা এমন করেছে, তাদের নাম জানি না। তবে তারা প্রায়ই কলেজে ঘোরাফেরা করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে ৮ থেকে ১০ জন কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন আমাকে হুমকি দিয়ে বাইরে নিয়ে যান। পরে মোটরসাইকেলে করে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘোরানো হয়। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার পরিচয় দিলে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিতে বলেন তাঁরা। অন্যথায় মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর আমাকে কলেজে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে রাত ১২টার দিকে আবারও ৮ থেকে ১০ জন এসে বিষয়টির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, ‘স্থানীয় লোকজন এসে যেভাবে চাঁদা দাবি করেন, তাতে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। ম্যানেজারকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত। ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছি। আমরা চাই, প্রশাসন জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিক।’
এদিকে, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় কয়েকজন যুবককে কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেখা গেছে সিসিটিভি ফুটেজে। নির্মাণকাজে বাধা ও চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে গত ১১ অক্টোবর কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। চিঠিতে কাজ বন্ধ রাখার পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘যারা ম্যানেজারকে তুলে নিয়ে গেছে, তাদের কাউকে আমরা চিনি না। এমন ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা শঙ্কিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কথা বলেছেন। তবে এখনো শঙ্কা কাটেনি।’
আনন্দমোহন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম সামসুজ্জামান বলেন, ‘ঘটনার দিন আমি ছুটিতে ঢাকায় ছিলাম। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে জানার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা হয়। পরে তারা ঘটনাস্থলে আসে। দুই দিন কাজ বন্ধ থাকলেও এখন আবার নির্মাণকাজ চলছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেল মিয়া বলেন, ‘নির্মাণকাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অপ্রত্যাশিত। আমরা চাই না, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক।’
অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শহরে চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ নেই। তারা আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। থানা, পুলিশ সুপার ও ডিআইজি কার্যালয়ের কাছেই আনন্দমোহন কলেজ। এখানে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’
শতবর্ষী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজ ঘিরে এমন অভিযোগকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক শিক্ষার্থী ও জেলা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আহ্বায়ক এ কে এম আরিফুল হাসান। তিনি বলেন, ‘দোষীদের বিচারের আওতায় আনা না হলে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘অভিযোগের দোহাই দিয়ে পুলিশ চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজি করার সুযোগ করে দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যেহেতু অভিযোগ দায়ের করতে ভয় পাচ্ছে, সেহেতু সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
