সান্দাকফুতে গিয়ে প্রাণ হারালেন উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের এক বাসিন্দা। এক মাসে এই নিয়ে দু’জনের মৃত্যু হল। তার পরেই পর্যটন সংস্থাগুলির তরফে দাবি তোলা হয়েছে যে, অমরনাথ যাত্রার আগে পর্যটকদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলে সান্দাকফুতেও তা করা হোক। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজ়ম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের এক কর্তা মনে করছেন, ট্রেক করার পরিবর্তে গাড়িতে চেপে সান্দাকফু যাত্রাই কাল হচ্ছে। অত উচ্চতার জন্য তৈরি হতে পারছে না শরীর। যদিও দিন কয়েক আগে যে ২৮ বছরের যুবকের মৃত্যু হয়েছিল, তিনি ট্রেক করেই রাজ্যের এই সবচেয়ে উচু জায়গায় উঠেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
সান্দাকফুর টুমলিঙে গত মঙ্গলবার মৃত্যু হয় ৪৮ বছরের বুবাই পালের। তাঁর সহযাত্রীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, হঠাৎই বুবাইয়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। শরীর ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। প্রথমে তাঁকে মানেভঞ্জন এবং সেখান থেকে সুখিয়াপোখড়ি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
প্রশাসন সূত্রে খবর, পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে ১৮ অক্টোবর নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে সোজা মানেভঞ্জনে পৌঁছোন বুবাই। পরের দিন সান্দাকফুতে রাত্রিবাসের পর ২০ অক্টোবর তারা টুমলিঙে পৌঁছোন। সেই রাতেই অসুস্থ হয়ে মৃত্যু হয় বুবাইয়ের।
দার্জিলিঙের জেলাশাসক হরিশঙ্কর পানিকের বলেন, ‘‘ময়নাতদন্তের পরে দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বারাসত ফেরার সমস্ত ব্যবস্থা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করে দেওয়া হয়েছে৷ ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার পরেই মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।’’
গত ৩০ সেপ্টেম্বর কোচবিহারের তুফানগঞ্জের বাসিন্দা প্রিয়তোষ অধিকারীরও শ্বাসকষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়। অহলদাড়া এলাকায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল তাঁর। জানা গিয়েছে, ২৭ বছর বয়সি যুবকের শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় বিপত্তি ঘটে।
দার্জিলিঙের মানেভঞ্জন থেকে প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর রূপ দেখতে দেখতে সান্দাকফু যাওয়ার অভিজ্ঞতা মনে থেকে যায় সারা জীবন। কিন্তু সেই যাত্রা অনেকের ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পর্যটন সংস্থাগুলি বলছে, ঝুঁকি এড়াতে কিছু নিয়ম মানতেই হবে। তাদের অভিযোগ, একের পর এক মৃত্যু ঠেকাতে একাধিক বার বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা প্রশাসনকে জানানো হলেও তা নিয়ে এখনও কোনও সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। সম্প্রতি সিটঙে মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে অগ্নিদদ্ধ হন এক তরুণী। পরিবার অভিযোগ করেছিল, সঠিক সময়ে তরুণীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স মেলেনি। একই অভিযোগে উঠেছে সান্দাকফুর এই ঘটনার পরেও। বুবাইয়ের পরিচিতেরা মনে করেন, অ্যাম্বুল্যান্স থাকলে হয়তো এই মৃত্যু এড়ানো যেত।
তবে হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক তন্ময় গোস্বামী বলেন, ‘‘সান্দাকফু আদি অনন্তকাল থেকেই ট্রেক রুট। এখন পর্যটকেরা এনজেপি বা জংশনে নেমেই হুড়হুড় করে গাড়ি ছুটিয়ে সোজা সান্দাকফু ওঠার চেষ্টা করেন। সেটাই কাল হয়েছে দাঁড়ায়।’’ তাঁর কথায়, ‘‘সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০ ফুট উচ্চতায় যাদের বসবাস, হঠাৎ করে ৫০০০ ফুট উচ্চতায় উঠতে গেলে শরীর মানবে কেন? এই কারণেই এটা ট্রেক রুট। শরীরকে আস্তে আস্তে ধাতস্থ করে বিশ্রাম নিয়ে উপরের দিকে উঠতে হয়।’’ তন্ময় জানান, অমরনাথ যাত্রার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যপরীক্ষা বাধ্যতামূলক। মেডিক্যাল রিপোর্ট সেখানে পেশ করতে হয়। কিন্তু এখানে একাধিক বার তা নিয়ে বলার পরেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অন্য দিকে, পর্যটকদেরও বাজেটের বিষয় থাকে। সে কারণে তাঁরা খুব কম সময়ে এই সান্দাকফু যাত্রা শেষ করতে চান। নিয়ম মেনে চললে, প্রথম দিন মানেভঞ্জনে থেকে পরের দিন সেখান থেকে টুমলিং যাওয়া উচিত। সেখানে এক রাত থেকে পরের দিন কালপোখরিতে রাত্রিবাস। তার পরের দিন সেখান থেকে সান্দাকফু ওঠা উচিত বলেই মত তন্ময়ের। তাঁর কথায়, ‘‘এ ভাবে শরীরকে ধাতস্থ করতে হয়। আর সান্দাকফু কোনও সময়ই গাড়িতে চেপে যাওয়ার জায়গা নয়। সব সময়েই ট্রেকিং করে সেখানে যাওয়া উচিত।’’
এই ঘটনায় রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘‘খুবই দুঃখজনক ঘটনা। তবে যে ব্যবস্থাপনা করার কথা উঠে এসেছে— স্বাস্থ্যপরীক্ষা থেকে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা, সেই কোনও প্রস্তাবই আমার কাছে এসে পৌঁছোয়নি। এখনও পর্যন্ত অনেক বৈঠক হয়েছে বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে। কিন্তু এমন প্রস্তাব আসেনি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলাম, প্রয়োজনীয় যা ব্যাবস্থা নেওয়ার তা আমাদের সরকার, আমার দফতর করবে।’’
