রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। সেই আলু ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তায় হিমাগারে রেখেছেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ১৪২ বস্তা আলু বিক্রি করে পেয়েছেন ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। কিছুদিন আগে প্রায় ২৫০ বস্তা আলু কেজিপ্রতি ১৫ টাকায় বিক্রি করেন।
তার হিসাবে, হিমাগার থেকে আলু তোলাসহ খরচ হয়েছে কেজিতে ৭ টাকা। এখন দাম ১১-১৪ টাকায় নেমে আসায় অবশিষ্ট আলু থেকে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন তিনি।
আতাউর রহমান বলেন, লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই কতটা তুলতে পারবো সেটিই ভাবছি। গত বছর ৬৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদে প্রায় ৫৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সেই টাকাই তুলতে পারিনি। এখন পথে বসার অবস্থা।
বর্তমানে জেলায় হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মাত্র ১১-১৪ টাকায়। এ দামে আলু তুললে কেজিতে ১৫ থেকে ১৬ টাকা লোকসান হবে বলে আপাতত বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই আলুচাষি। তবে সামনে লোকসান কমার সম্ভাবনাও দেখছেন না। যে কারণে আলু উত্তোলনে আগ্রহ কম তার। এ পরিস্থিতি কেবল আতাউরের নয়, হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা অধিকাংশ কৃষকেরই একই অবস্থা।
দেশের বিভিন্ন বাজারে সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী হলেও রংপুরের খুচরা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২০-২২ টাকায়। আর রাজধানী ঢাকায় ২৫-৩০ টাকা। এ দামে বিপাকে পড়েছেন হিমাগারে আলু রাখা চাষি ও মজুদদাররা। অনেকেই আপাতত আলু উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন। দাম এমন থাকলে কেউ কেউ আর আলু তুলবেন না বলেও জানিয়েছেন।
আলু নিয়ে ৩ সংকট, সম্ভাব্য লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা
রংপুরে আলুর বাম্পার ফলন কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৫১ লাখ ৭৬ হাজার টনের বেশি উৎপাদনের বিপরীতে হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ হয়েছে মাত্র ২৩ শতাংশ আলুর। সংরক্ষিত আলুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখনো হিমাগারে পড়ে আছে।
এরই মধ্যে মাঠে শুরু হয়েছে নতুন আলুর চাষ। ফলে পুরোনো ‘মজুত, সীমিত সংরক্ষণ ক্ষমতা ও বাজারে কম দাম’—এই তিন সংকটে বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বর্তমান দরে কেজিতে ১৪-১৬ টাকা লোকসান ধরলে শুধু রংপুর বিভাগের উৎপাদিত আলুতেই কৃষকের সম্ভাব্য লোকসান দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
সংরক্ষিত আলুর ৭৩.৮ শতাংশ এখনো হিমাগারে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। অথচ ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা উৎপাদনের ২৩.১ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর ৭৩.৮ শতাংশ (৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন) এখনো হিমাগারে মজুত রয়েছে।
অন্যদিকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৪০২টি হিমাগার ও ৭০৩টি অ-হিমায়িত মডেল ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন, যা মোট উৎপাদনের ২৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন খাবার ও ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন বীজ আলু।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) হিসাবে, তাদের হিমাগারে এবার ৩৩ লাখ টনের বেশি আলু রাখা হয়েছে, যার মধ্যে এখনো ১৫ লাখ টনের বেশি মজুত আছে। গত বছর কম দামের কারণে কৃষকরা দুই লাখ টন আলু হিমাগার থেকেই তোলেননি।
আলু থেকে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে সংশয়ে চাষিরা
রংপুর মহানগরীর ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায় দুটি হিমাগারে ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন। বর্তমানে হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মাত্র ১১-১৪ টাকায়। এ দামে আলু তুললে কেজিতে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা লোকসান হবে বলে আপাতত বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
ভুপাল-আতাউরের মতো অন্তত ১৫ জন আলুচাষি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে প্রতিকেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১১-১৪ টাকায়। এর মধ্যে কেজিপ্রতি প্রায় ৭ টাকা হিমাগার ভাড়া দিতে হচ্ছে। ফলে আলু বিক্রি করে কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ৭-৮ টাকা।

অন্যদিকে, হিমাগারে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ১৭ থেকে ১৮ টাকা। ফলে বর্তমান দরে বিক্রি করলে কেজিপ্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে ১০ থেকে ১১ টাকা। মৌসুমের শুরুতে আলুর দাম না থাকায় প্রায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে কেজিতে ৮ থেকে ৯ টাকা লোকসানে আলু বিক্রি করতে হয়েছে।
তারাগঞ্জের বামনদীঘি গ্রামের কৃষক নাহিদুজ্জামান বলেন, এবার বৃষ্টির পানিতে আলু পচে উৎপাদন কমে গেছে, যার কারণে খরচ বেড়েছে। এক কেজি আলু উৎপাদনে ২০ টাকা পড়েছে, বাধ্য হয়ে ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি। মৌসুমের শুরুতে কেজিতে ১০ টাকা লোকসান হয়েছে।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার কৃষক আমজাদ হোসেন এরই মধ্যে জমিতে নতুন আলু লাগিয়েছেন। অথচ তার আগের মৌসুমের আলু এখনো হিমাগারে। লোকসান কমানোর আশায় তিনি পুরোনো আলু রেখে নতুন করে আলু চাষ শুরু করছেন বলে জানান।
হিমাগারে চাপ তবুও আলু তোলেননি অনেক কৃষক
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শাহজালাল ও গঙ্গাচড়া উপজেলার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, গত দুই দিন ধরে হিমাগার গেটে প্রকারভেদে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১১-১৪ টাকায়। হিমাগার দুটির ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১৫ হাজার ও সাড়ে ৯ হাজার টন, বর্তমানে সেখানে যথাক্রমে ৪০ ও ৪৮ শতাংশ আলু মজুত রয়েছে।
পীরগাছা উপজেলার নব্দীগঞ্জের অপু মুন্সি হিমাগারের ব্যবস্থাপক রবিউল বলেন, গত বছর একাধিকবার তাগাদা দিয়েও অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ে আলু তোলেননি। ফলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ ১ লাখ ৬৬ হাজার বস্তা আলু কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এতে ২৫-৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
তারাগঞ্জ উপজেলার এনএন হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ২ লাখ ৫০ হাজার বস্তার মধ্যে মাত্র ৬৩ হাজার বস্তা আলু বের হয়েছে। অন্য বছরগুলোয় ৩ ভাগের ২ ভাগের বেশি আলু এই সময় বের হতো।
তিনি আরও বলেন, আগামী ৪৫ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে বাজারে নতুন আলু আসবে। যে হারে এখন হিমাগারে আলু কেনাবেচা হচ্ছে, তাতে হিমাগারে সংরক্ষণ করা সব আলু বের হওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত বছর মাইকিং করেও আলু বের করেননি চাষিরা, ফেলে দিতে হয়েছে। এবারও যদি এমন হয়, তাহলে আমাদেরও লোকসানে পড়তে হবে।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, এবার জেলার ৪২টি হিমাগারে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ টন খাবার ও বীজ আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২১ টন।
জেলা কৃষি অফিস জানায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আগাম আলুর আবাদ হয়েছে। গত বছর এ আবাদ ছিল তিন হাজার হেক্টর। এবারো একই পরিমাণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আলুতে বাড়ছে লোকসান, বিকল্পে উৎসাহ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ
বিসিএসএর তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের গড় ব্যয় ১৬ টাকা, আর মুন্সীগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকায় ১৯ টাকা। এর সঙ্গে কেজিপ্রতি ৬ টাকা হিমাগার ভাড়া এবং বস্তা, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ করলে বাজারজাত পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৫ টাকা। অথচ রংপুরে ২০ টাকা আর রাজধানীর খুচরা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকায়।
শুধু কৃষক নন, আলু নিয়ে চাপে রয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। চলতি বছর রংপুরে হিমাগার ভাড়া নিয়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে তারা আন্দোলনও করেছেন।
রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, হিমাগার ভাড়া বেশি হওয়ায় আলু সংরক্ষণ করেও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না। ভাড়া কমানোর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন হলেও হিমাগারের মালিকেরা তা মানছেন না। আমরা ৫ টাকা কেজি ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়েছি। এতে কিছুটা হলেও লোকসান কম হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, গত দুই বছর থেকে আলুতে লোকসান হচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে চাষিরা পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করছেন না। উৎপাদনটা চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, শুধু আলু না করে কিছু জমিতে ভুট্টা, সবজি, ধান চাষ করার। যাতে একটাতে লোকসান হলে অন্যটাতে পোষাতে পারে। কিন্তু কৃষকদের আলু চাষাবাদ নেশার মতো হয়ে গেছে।
সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে আলু কেনার পরামর্শ
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টন। আগের মৌসুমে ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৬ লাখ টন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষক লোকসানে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহার বাড়ানো ও সরকারি সহায়তার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, আলুর দাম ১৩ টাকায় নেমে যাওয়ায় হিমাগার থেকে আলু বের হওয়া ধীর হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫ টাকা, তাই লোকসানের ভয়ে তারা আলু তুলছেন না। গত বছরও দুই লাখ টন আলু তোলা হয়নি। কৃষক আলু না নিলে আমরা ভাড়া পাব না, আবার পচন ঠেকাতে মেশিন চালিয়ে পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। সরকার কৃষককে ভর্তুকি দিক, প্রয়োজনে কিছু আলু কিনে নিক।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আলুচাষিরা বছরের পর বছর লোকসান গুনছেন। এখানে সরকার দুটো উদ্যোগ নিতে পারে। কৃষকের হিমাগার ভাড়ার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি বা শেয়ার করতে পারে। দ্বিতীয়টি আলুচাষিকে মূল্য সহায়তা দিয়ে লোকসান থেকে রক্ষা করতে পারে।
আরএআর
