নিজের স্বার্থ নিজেকেই দেখতে হয়, নিজের নিরাপত্তা বিধানের কাজটিও করতে হয় নিজেকেই। অন্যরা যে সাহায্যের হাত বাড়ায় না, তা কিন্তু নয়; তবে সেখানে মুখ্য হয় তাদের নিজেদের স্বার্থ। সময়ে সাহায্যের সেই হাত সরিয়ে নিতে বিলম্ব ঘটে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কি এখন তেমন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে? মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তেলের বিনিময়ে নিরাপত্তা দেয়ার দীর্ঘদিনের নীতি থেকে সরে আসছে আমেরিকা। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে আর আধিপত্য বজায় রাখতে চায় না ওয়াশিংটন। দেশটির সিনিয়র কূটনীতিক টম ব্যারাক মঙ্গলবার কাতারের দোহায় ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে’ বক্তব্য দিতে গিয়ে এমন ইঙ্গিত দেন। তবে এর অর্থ আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার পুরোপুরি সরে যাওয়া নয় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। বরং এ অঞ্চলের সরকার ও শাসনব্যবস্থাকে নতুন রূপ দেয়ার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর নিজেদের ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করছে ওয়াশিংটন। উল্লেখ্য, টম ব্যারাক তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন এবং সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ব্যারাক বলেন, ‘আমেরিকা আর কোনো কিছুর মালিকানা নিতে চায় না। এখানে মূল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং জায়গাটি ছেড়ে না যাওয়া। আমরা চলে যাচ্ছি না।’
টম ব্যারাক অবশ্য স্বীকার করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ক্রমেই মার্কিন সম্পৃক্ততার সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারছে। তিনি বলেন, ‘এ অঞ্চলের সবাই এখন বলছেন, সব সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা আমেরিকার ওপর নির্ভর করতে পারি না।’ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার অতীত হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ব্যারাক। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ‘২৩টি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ ঘটনায় জড়িত ছিল আমেরিকা। প্রতিবার কোন ব্যক্তি বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে হস্তক্ষেপের পর সেটিকে ভুল মনে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ব্যারাক এমন এক সময়ে এই বক্তব্য রাখলেন, যখন ইরানে আমেরিকা ও ইসরাইলের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটনও তেহরান আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করছে।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক লুসিয়ানো জাকাররা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে ব্যারাকের বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে ট্রাম্পের মিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বাস্তববাদী অবস্থান তুলে ধরেছেন টম ব্যারাক। জাকাররা আলজাজিরাকে বলেন, ব্যারাক কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত অন্যতম লক্ষ্য, ইরান সরকারের পরিবর্তনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সরকার পরিবর্তন নিয়ে ব্যারাকের মন্তব্য কার্যত এ স্বীকারোক্তি যে, আমেরিকায় যে প্রশাসনই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এ অঞ্চলে দেশটি এতদিন যা করে এসেছে, তা সফল হয়নি। উদাহরণ আরো আছে, ইউক্রেন এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে দেশটিকে রক্ষা করতে পেরেছে কি আমেরিকা? বরং পুতিনের সাথে এখন উষ্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বড় দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য আঁতাত বিরাজমান রয়েছে। অনেকে বিষয়টিকে ‘ভীতির ভারসাম্য’ বলে অভিহিত করেছেন। বাস্তবতা হলো, ছোট দেশগুলোকে কূটনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেদেরই সাজাতে হবে। অন্যের ওপর ভরসা করে লাভ নেই।
