প্রবাসের মাটিতে ক্রিকেটের ব্যাট-বলের লড়াই, আর সেই লড়াইয়ের সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের এক সুতোয় বাঁধার উদ্যোগ। ৩০ দেশের ক্রিকেট ক্লাবকে নিয়ে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপেশাদার ক্রিকেট চ্যাম্পিয়নশিপ ‘এক্সপ্যাট ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৭’। শুধু একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নয়, আয়োজকদের পরিকল্পনায় এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনমেলা, সাংস্কৃতিক সংযোগ ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া কূটনীতির নতুন মঞ্চ।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে টুর্নামেন্টের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ উপলক্ষে কেক কাটা ও ট্রফি উন্মোচনের মধ্য দিয়ে আয়োজনটির যাত্রা শুরু হয়। টুর্নামেন্টটির আয়োজক এবি মিডিয়া গ্রুপ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। আয়োজনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘এমন আয়োজন প্রবাসীদের জন্য দারুণ আয়োজন। যারা আমাদের রেমিট্যান্স পাঠায়, তাদের জন্য এমন আয়োজন তাদেরকে উৎসাহিত করবে। তিনি আরও বলেন, ‘৩০টি দেশের ক্রিকেট ক্লাবকে সম্পৃক্ত করে এই টুর্নামেন্টের আয়োজন প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নতুন আশা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে স্পোর্টস ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব। এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশি ও দেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে সংযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। হামজা চৌধুরীরা যেমন বাংলাদেশ ফুটবলের ইমেজ সমৃদ্ধ করেছে। আমরা আশা করি, প্রবাসীদের মধ্যে কেউ জাতীয় ক্রিকেট দলে খেলবে এবং ইমেজ বাড়াবে।’
এ সময় তিনি দেশের ৪৯৫টি উপজেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক্সপ্যাট ওয়ার্ল্ড কাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জাপান, বাংলাদেশ, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও মালয়েশিয়ায়। উদ্বোধনী ম্যাচ হবে অস্ট্রেলিয়ায়, আর ফাইনালের ভেন্যু হিসেবে থাকছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হিসেবে থাকছে ফাইনাল ঘিরে গালা নাইট। এবি মিডিয়া গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কবির আহমেদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, গালা নাইটে বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খানকে উপস্থিত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে আয়োজকদের।
প্রথম আসরে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া, ওমান, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, সুইডেন, পোল্যান্ড, ইতালি, সৌদি আরব, কুয়েত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ড, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, নেদারল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জাপান ও বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩০টি দেশের ক্লাব অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
আয়োজনটির লক্ষ্য শুধু প্রবাসীদের মধ্যে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা সীমাবদ্ধ রাখা নয়। বিদেশে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ ও সক্ষমতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এবি মিডিয়া গ্রুপের সিইও কবির আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের বিশাল যুবসমাজকে সঠিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার মাধ্যমে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশিদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা যাবে।’
অন্যদিকে, এবি মিডিয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নির্জন মোশাররফ জানান, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল এই আয়োজন। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সরকার ক্রীড়াবান্ধব। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। টুর্নামেন্ট সফলভাবে সম্পন্ন করতে আইসিসির ইভেন্ট ম্যানেজারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন আয়োজকেরা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সম্প্রচার নিশ্চিত করতে একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাবেক ক্রিকেটারদের বক্তব্যেও উঠে আসে প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের ক্রিকেটের সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যাশা।
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার বলেন, ‘বাংলাদেশিদের কাছে ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়; এটি আবেগ, ভালোবাসা ও ঐক্যের শক্তিশালী বন্ধন। ক্রিকেটের মাধ্যমে হাজার মাইল দূরে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের একত্রিত করা এবং তাঁদের মধ্যে দেশীয় পরিচয়, গর্ব ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করা সম্ভব।’
বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান মেহরাব হোসেন অপি মনে করেন, ৩০ দেশের অংশগ্রহণে এমন আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ধারাবাহিকভাবে টুর্নামেন্ট আয়োজনের পাশাপাশি দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করলে উদ্যোগটি আরও কার্যকর হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সাবেক ক্রিকেটার জাভেদ ওমর বেলিমও মনে করেন, এই আয়োজন প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্রিকেট সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর আমাদের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। জুলাই আন্দোলনেও আমরা তাদের অবদান দেখেছি। তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। আমরা এই আয়োজনের সাথে অবশ্যই থাকবো।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের জান্নাতুল সুমনা, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক রফিকুল ইসলাম বাবু, এক্সপ্যাট ওয়ার্ল্ড কাপের উপদেষ্টা আফজাল হোসেন ও বেলাল উদ্দিন তুহিন, ক্রীড়া সংগঠক মাসুম ভূঁইয়া, ক্রীড়াবিদ শরিফুল হক শিপন, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংগঠক রিমন ইসলাম এবং পিটুপি গ্রুপের চেয়ারম্যান এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ মহসিনসহ অনেকে।
এক্সপ্যাট ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৭-এর মধ্য দিয়ে ক্রিকেটকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় আয়োজক প্রতিষ্ঠান। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে দেশীয় পরিচয়, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার যে সংযোগ তৈরি হতে পারে, সেটিই হতে পারে এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
