আজকাল ওয়েবডেস্ক: তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দলাই লামার পরবর্তী উত্তরসূরি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এবার আন্তর্জাতিক মহলের কাছে স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা দিল নির্বাসিত তিব্বতি সরকার (CTA)। ভারতের ধর্মশালা থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিব্বতি নেতৃত্ব জানিয়েছে, দলাই লামার পুনর্জন্ম ও উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার জন্য এখন থেকেই গোটা বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজ ও আন্তর্জাতিক নেতাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে। একই সঙ্গে বেজিংয়ের চাপিয়ে দেওয়া যেকোনও ধরনের উত্তরসূরি বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তৈরি হওয়া নির্বাচনকে যেন বিশ্বমঞ্চ কোনওভাবেই স্বীকৃতি না দেয়, সেই কড়া আর্জিও জানিয়েছে তারা।
দলাই লামা ৯১ বছরে পা রাখার পর থেকেই তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে নির্বাসিত তিব্বতি প্রশাসন এবং চিনা কমিউনিস্ট সরকারের মধ্যে টানাপোড়েন এক নতুন মোড় নিয়েছে। তিব্বতি নেতৃত্বের স্পষ্ট অভিযোগ, চিনের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে তারা তিব্বতের বৌদ্ধ ঐতিহ্য ভেঙে নিজেদের মনোনীত কোনও ‘পুতুল’ উত্তরসূরিকে বসিয়ে দিতে পারে—ঠিক যেভাবে অতীতে আসল প্যানচেন লামাকে উধাও করে দিয়ে তাদের নিজস্ব পছন্দের প্রতিনিধি বসানো হয়েছিল। ধর্মশালার কর্মকর্তারা জানান, ইতিমধ্যেই বিশ্বের ৩৮টিরও বেশি দেশ এবং দেড় শতাধিক আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সংগঠন বেজিংয়ের এই অযাচিত ধর্মীয় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
এত বিরোধের মাঝেও অবশ্য তিব্বত পুরোপুরি স্বাধীনতা চাওয়ার পথ থেকে সরে এসে তাদের পুরনো ‘মিডল ওয়ে পলিসি’ বা মধ্যপন্থার নীতিতেই অনড় রয়েছে। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হল চিনের ভেতরে থেকেই তিব্বতি ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির জন্য অর্থপূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। যদিও ২০০২ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে চিনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা হলেও ২০০৮ সালের বেজিং অলিম্পিকের পর সেই সংলাপ পুরোপুরি থমকে যায়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সহায়তায় কোনও পূর্বশর্ত ছাড়াই চিনের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা শুরুর আবহ তৈরির চেষ্টা করছে তিব্বতি প্রশাসন।
তবে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে বেজিংয়ের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ। বিশেষ করে গত বছর চালু হওয়া চিনের নতুন ‘জাতিগত সংহতি আইন’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিব্বতি নেতারা। তাঁদের দাবি, জাতীয় ঐক্যের নামে আসলে অত্যন্ত ধূর্তভাবে আইনের চাদরে মুড়ে তিব্বতের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচিতি মুছে ফেলার চক্রান্ত চলছে। শিশুদের স্কুলে ম্যান্ডারিন ভাষা বাধ্যতামূলক করা, প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানে সরকারি হস্তক্ষেপ বাড়ানো এবং ধর্মীয় মঠগুলিকে জোর করে চীনা ভাবধারায় পরিচালনা করার মতো নীতি তিব্বতিদের নিজ ভূমে পরবাসী করে তুলছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে ড্রোন, ফেসিয়াল রেকগনিশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি। এমনকি দেশের বাইরে যারা তিব্বতের অধিকার নিয়ে কথা বলবেন, তাদের ওপরও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি রাখা হয়েছে এই আইনে।
এই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই ভারত, নেপাল ও ভুটানে বসবাসকারী নির্বাসিত তিব্বতিদের সমাজ ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি জোরদার করছে তিব্বতি সরকার। পাশাপাশি ভাষা ও ধর্মীয় দলিল সংরক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে তিব্বতি নেতৃত্বের সাফ বক্তব্য—তিব্বতের এই সংকটকে কেবল চিনের ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ হিসেবে দেখে পাশ কাটিয়ে গেলে চলবে না। বিশ্বের গণতন্ত্রকামী দেশগুলোকে এখনই দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে, যাতে তিব্বতের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কোনও স্বৈরাচারী রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়।
