রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মিড-ডে মিল চালুর প্রশংসনীয় উদ্যোগ থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি বা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মিড-ডে মিল চলা এসব স্কুলে হাত ধোয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক জায়গায় হাত ধোয়ার বেসিন থাকলেও তা অপরিষ্কার ও অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে আছে, যা কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গোদাগাড়ী উপজেলার ১৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩১ হাজার শিক্ষার্থী এই সুবিধার আওতায় রয়েছে এবং বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হারও সন্তোষজনক, যা প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের রান্না করা খাবারের পরিবর্তে সাধারণত রুটি, কলা, ডিম, দুধ ও বিস্কুটের মতো পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়ে থাকে। তবে খাবার খাওয়ার আগে অপরিহার্য শর্ত অর্থাৎ স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে হাত ধোয়ার বিষয়টি চরম উপেক্ষিত থাকছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) উপজেলার দারিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাংলাকান্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পূর্ব বামনাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, হাত ধোয়ার নির্দিষ্ট স্থানে কোনো সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ নেই। পূর্ব বামনাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশরুমের বেসিনে সাবান পাওয়া গেলেও পুরো পরিবেশ ছিল বেশ অপরিষ্কার। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিউলি সরকার প্রথমে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়ার সামগ্রী বরাদ্দের কথা দাবি করলেও পরে স্বীকার করেন যে, এর জন্য কোনো সরকারি বরাদ্দ নেই। শিক্ষকদের নিজেদের উদ্যোগে এবং শিক্ষার্থীদের সহায়তায় কোনোমতে এই কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে দারিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবনের এই বিদ্যালয়ে যাতায়াতের ভালো কোনো রাস্তা নেই। বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষের পাশে হাত ধোয়ার বেসিন থাকলেও সেখানে তিনটি ট্যাপের জায়গায় দুটি রয়েছে এবং মাঝখানেরটি ভাঙা। পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে অফিস সহায়ককে ডেকে শিক্ষার্থীদের হাতে সাবান দেওয়া হয়, যা থেকে স্পষ্ট যে নিয়মিত তদারকির অভাব রয়েছে। এছাড়া বেসিনের ওপর ডিটারজেন্ট পাউডার রাখা ছিল, যা দিয়ে মূলত শিক্ষকদের বাসনপত্র ধোয়া হয়। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক জেসমিন নাহারও সরকারি বরাদ্দের ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন।
চিকিৎসকদের মতে, হাত পরিষ্কার না করে খাবার গ্রহণ করলে শিশুদের শরীরে নানা ধরনের মারাত্মক সংক্রামক রোগ বাসা বাঁধতে পারে। হাতের ময়লা ও ক্ষতিকর জীবাণু খাবারের সঙ্গে মুখে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, পেটের সংক্রমণ, বমি এবং হেপাটাইটিস ‘এ’-এর মতো রোগের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে মাটিতে থাকা কৃমির ডিম হাতের মাধ্যমে মুখে প্রবেশ করলে শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি, রক্তস্বল্পতা এবং স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তাই মিড-ডে মিল চালু থাকা স্কুলগুলোতে খাবার গ্রহণের পূর্বে সাবান দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি ও অভিভাবক রিনা খাতুন জানান, সভার আলোচনায় হাত ধোয়ার সাবান না থাকার বিষয়টি সাধারণত উঠে আসে না। তবে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা স্বীকার করে তিনি বলেন, হাত ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খাবার খেলে শিশুদের পেটের নানা অসুখ হতে পারে। অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, শিক্ষার্থীদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সুস্বাস্থ্য ও রোগমুক্ত জীবন নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত সাবান ও হাত ধোয়ার উপকরণের সরকারি বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
