ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা ও কংগ্রেসের সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে এক অন্তঃসত্ত্বা সাংবাদিককে ধাক্কা দেওয়া ও হাত ধরে জোরে টানার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে বিরোধীদের বিক্ষোভ চলাকালে এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছেন ওয়ানইন্ডিয়া সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক রিচা পরাশর। তিনি বর্তমানে দিল্লির একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে রিচা জানান, রাহুল গান্ধীর সমর্থকেরা তার বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য করছেন এবং তার অভিজ্ঞতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করছেন। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
তিনি বলেন, ‘এটি কংগ্রেস বা বিজেপির বিষয় নয়। আমি একজন সাধারণ নাগরিক, নিজের দায়িত্ব পালন করছিলাম। মানুষ যেসব কথা বলছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
হাসপাতালে বিজেপি নেতারা তাকে দেখতে গেলে তাদের সামনেই ক্যামেরার সামনে ঘটনার বর্ণনা দেন রিচা। তার অভিযোগ, রাহুল গান্ধী তার হাত ধরে এত জোরে টান দেন যে তিনি ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। এ সময় তার হাঁটু ও পেট শক্ত মেঝেতে আঘাত পায়।
রিচার আরও অভিযোগ, রাহুল গান্ধী তার ক্যামেরাপারসনকেও ধাক্কা দেন। এতে ওই ব্যক্তি তার ওপর পড়ে যান। এরপর আরও চার-পাঁচজন তাদের ওপর পড়ে গেলে পরিস্থিতি আরও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে।
কী ঘটেছিল সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে?
রিচার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র বিক্ষোভ চলাকালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে একটি ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রাহুল গান্ধী বেরিয়ে এলে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি।
রিচা বলেন, প্রথমে তিনি রাহুলের দিকে মাইক্রোফোন এগিয়ে দেন। রাহুল ইশারায় মাইক্রোফোন সরিয়ে নিতে বললে তিনি সেটি সরিয়ে নেন। কিন্তু অন্য সাংবাদিকেরা আবার মাইক্রোফোন এগিয়ে দেওয়ায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য তিনিও নিজের মাইক্রোফোন সামনে নেন।
এরপর কী ঘটেছিল, তা বর্ণনা করে রিচা বলেন, রাহুল গান্ধী তার দিকে এগিয়ে এসে তার হাত ধরে জোরে টান দেন। পরে তার নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে সরিয়ে দেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রবেশপথে কয়েকটি সিঁড়ি থাকায় ভিড়ের মধ্যে তিনি সামনের দিকে পড়ে যান বলে দাবি করেন এই সাংবাদিক।
তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা বলে জানিয়েছেন রিচা। তার দাবি, ঘটনার সময় সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে তিনি পরিস্থিতি সামলানোর সুযোগ পাননি।
ভিডিও নিয়ে পালটাপালটি দাবি
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন রিচা। তবে কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের দাবি, ভিডিওতে রাহুল গান্ধী তাকে ধাক্কা দিয়েছেন বা হাত ধরে টেনেছেন—এমন কিছু স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।
কংগ্রেস নেত্রী অলকা লাম্বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে রিচার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তার দাবি, ঘটনার সময়ক্রম নিয়ে বেশ কিছু অসংগতি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে অপপ্রচার তৈরির অভিযোগও তোলেন।
লাম্বা প্রশ্ন তোলেন, রিচার দাবি অনুযায়ী বিকেল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে ঘটনা ঘটলে তাকে রাত সাড়ে ৮টায় হাসপাতালে নেওয়া হলো কেন। তার আরও অভিযোগ, রিচার বোন বিজেপির এক বিধায়কের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় এক্স-রে করানোর বিষয়টিও তিনি প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন।
তবে এসব দাবি ও প্রশ্নের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে, রিচা দাবি করেছেন, বিশৃঙ্খলার মধ্যেই ধারণ করা একটি ভিডিওতে তাকে হাত ধরে টানার ঘটনা দেখা যায়। তার বক্তব্য, রাহুল গান্ধী প্রথমে তাকে টান দেন এবং এরপর তার ক্যামেরাপারসনকে ধাক্কা দেওয়া হয়। এতে তিনি হাঁটু ও পেটের ওপর ভর দিয়ে পড়ে যান এবং ক্যামেরাপারসনও তার ওপর পড়ে যান।
রিচার আরও দাবি, এ ঘটনায় তার মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে এবং মাইক্রোফোনের রিসিভারও খুলে পড়ে গেছে। ভিডিওতে তার নিজের কণ্ঠস্বর শোনা যায় বলেও জানান তিনি।
তিনি জানান, রাহুল গান্ধীর সঙ্গে তিনি অত্যন্ত ভদ্রভাবে কথা বলছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতার কাছ থেকে এমন আচরণ তিনি আশা করেননি। ঘটনার মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, তিনি আর শ্বাস নিতে পারবেন না।
বিজেপির তীব্র আক্রমণ
ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিজেপি। দলটির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি অভিযোগ করেন, অন্তঃসত্ত্বা সাংবাদিককে সাহায্য করার পরিবর্তে কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা তার বক্তব্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
সাংবাদিককে দেখতে হাসপাতালে যাওয়া বিজেপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন ভান্ডারিও। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলা রাহুল গান্ধী গুন্ডার মতো আচরণ করেছেন।’
কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরার জনপ্রিয় স্লোগান ‘লড়কি হুঁ, লড় সকতি হুঁ’ উল্লেখ করেও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন তিনি। ভান্ডারির দাবি, এই ঘটনা কংগ্রেসের প্রকৃত চেহারা সামনে এনেছে।