‘এনসিটিবির দরপত্রে বড় কারসাজি : বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপতে মিলেমিশে লুটপাট’ শীর্ষক দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
রোববার এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মুহাম্মদ আবু নাছের টুকু স্বাক্ষরিত প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এ কার্যক্রমে দরপত্র আহ্বান, মূল্য নির্ধারণ, মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন এবং বইয়ের মান ও সরবরাহ তদারকির প্রতিটি পর্যায়ে প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে।
সরকারি অর্থের সাশ্রয় ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
প্রতিবেদনে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ফর্মাপ্রতি গড় প্রাক্কলিত দর ২ টাকা ৩১ পয়সা থেকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ৩ টাকা ৩২ পয়সায় উন্নীত হওয়ার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা সঠিক নয় বলে দাবি করেছে এনসিটিবি।
প্রতিবাদলিপি অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ফর্মাপ্রতি গড় প্রাক্কলিত দর ছিল ৩ টাকা ১৫ পয়সা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সংশোধিত প্রাক্কলিত দর হয়েছে ৩ টাকা ২৫ পয়সা। এতে বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রাথমিক স্তরে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ফর্মাপ্রতি প্রাক্কলিত দর ছিল ৩ টাকা ৫০ পয়সা, যা ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সংশোধিত হয়ে ৩ টাকা ৬১ পয়সা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এনসিটিবির ব্যাখ্যায় বলা হয়, ২০২৬ থেকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় ১০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাবে কাগজের পাল্প, মুদ্রণ ও পরিবহণ খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে।
দরপত্র চলাকালে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রাক্কলিত দর পুনর্নির্ধারণ এবং দর প্রকাশের অভিযোগের বিষয়ে এনসিটিবি জানায়, মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের ৭৫ জন প্রতিনিধি জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আবেদন করেছিলেন। এ বিষয়ে এনসিটিবির ৪২৩তম বোর্ড সভায় আলোচনা হয়।
পরে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫-এর ২৫(৯) ও ২৫(১০) বিধি অনুসরণ করে প্রাক্কলিত দর পুনর্নির্ধারণ করে।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, অনুমোদিত সংশোধিত প্রাক্কলিত দর ইজিপি পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট কমিটি ইনপুট দেয়। এ প্রক্রিয়ায় ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে দর প্রকাশের অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেছে এনসিটিবি।
৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগের জবাব
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণে ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগও নাকচ করেছে এনসিটিবি। প্রতিবাদলিপিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট পাঠ্যপুস্তক ছিল ৩০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪টি। এ জন্য ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৫৫৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মোট ৩১ কোটি ৫ লাখ ৫ হাজার ৩৯৫টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৫৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
এনসিটিবির হিসাবে, দুই শিক্ষাবর্ষের মধ্যে পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা বেড়েছে ১ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার ২৪১টি। বাড়তি বইয়ের মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং কাগজ, মুদ্রণ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ব্যয় বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক বলা যায় না। এ কারণে ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগকে অবান্তর বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, এনসিটিবির কোনো কর্মকর্তা বা মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহসংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।