উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখানো খোঁজ মেলেনি নাহিদুর রহমান তুহিন দম্পতি ও তাঁদের দুই মেয়ের। নিখোঁজরা হলেন, নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৮) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
টুপটুপ রিসোর্টের বুকিং নথিতে দেখা যায়, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত রিসোর্টের ২০২ নম্বর কক্ষে তাদের বুকিং ছিল। ১০ জন নিহতের মধ্যেও নেই তাঁদের নাম। হাসপাতাল, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে এই পরিবারের বিষয়ে স্পষ্ট কোন তথ্য নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিহত ও আহতদের তালিকায়ও তাদের নাম পাওয়া যায়নি। বুকিংয়ের নথি থাকার পরও পরিবারের সদস্যদের খোঁজ না মেলায় উদ্বেগে রয়েছেন নাহিদুরের বাবা ও আত্মীয়স্বজনরা।
নাহিদুর রহমান তুহিন যশোর জেলার মনিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর কারিকরপাড়ার বাসিন্দা মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা এবং দুই মেয়ে রোবাইনা ও সুনাইনাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন।
রিসোর্টের বুকিং নথি অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দুই রাতের জন্য নাহিদুর রহমানের নামে ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষটি অগ্রিম বুকিং করা হয়েছিল। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল। বুকিংয়ের বিলের কপিটি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত আছে।
নিখোঁজ নাহিদুর রহমান তুহিনের বাবা মতিয়ার রহমানের সাথে ছেলের শেষ কথা হয়েছিল গত শনিবার রাতে। তুহিন জানিয়েছেন, আপনার নাতিরা সী-বিচে খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো বাবা। এই ছিল তার সাথে নাহিদুরের শেষ কথা। এরপর থেকে ছেলের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না মতিয়ার রহমান। তিনি এখন কি করবেন, তা-ও বুঝে উঠতে পারছেন না।
মতিয়ার রহমান বলেন, ছোট ছেলের সঙ্গে ঢাকায় থাকি। মাস দেড়েক আগে গ্রামে এসেছি। বুধবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। শুক্রবার রাতেও কথা হয়।
এদিকে নাহিদুরের খোঁজে কক্সবাজার এসেছেন তুহিনের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স। তিনি বলেন, তার ভাই শুক্রবার কক্সবাজার যাবেন বলে জানিয়েছিলেন। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তিনি নাহিদুরকে ফোন করেন। কিন্তু, নাহিদুর বা তার পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এরপর থেকে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা তাদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছেন।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই ভাতিজির আর কোনো খোঁজ মিলছে না। তারা আগুনে পুড়ে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয়ের লাশগুলোর মধ্যে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে তিনি সিলেট থেকে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন।
তিনি বলেন, যে চারটি লাশ রয়েছে, তার মধ্যে দুটি শিশুর। তবে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারছি না। চেহারা চেনার মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। আহতদের মধ্যেও আমার ভাই ও তার স্ত্রী নেই। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এর বেশি আর কিছু বলতে পারব না।
তিনি আরও জানান, টুপটুপ রিসোর্টের মেমো থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বুকিং দিয়েছিলেন নাহিদুর রহমান তুহিন।
নাহিদুরের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামান জানান, তিনি চীনে রয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর শোনার পর তিনি ও প্রতিষ্ঠানের অন্যরা নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। নাহিদুরকে ভালো কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, খবরটি শোনার পর থেকে তিনি অসহায় বোধ করছেন।
নাহিদুর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাহিরা সিদ্দিকা সূচি জানান, নাহিদুরের পরিবার উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। বাড়িতে তার বৃদ্ধ বাবা-মা আছেন; তারাও যোগাযোগ করতে পারছেন না।
নিখোঁজ নাহিদুরের প্রতিবেশীরা জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছেন নাহিদ। রাজধানীর শ্যামলীতে ‘গ্র্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। পরিবার নিয়ে থাকতেন মিরপুরে। গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের ওই রিসোর্টে বুকিং দিয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন তারা।
নাহিদের ফুফু রোকসানা আক্তার রূপালী বলেন, ‘আমার বাজান মারা গেছে, আমি বিশ্বাস করি না। এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি তাদের মৃত্যুর বিষয়। তারা হয়তো কোথাও আছে।’ এই কথা বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন তিনি।
নাহিদের চাচা খালিদুর রহমান বলেন, ঢাকার কর্মস্থল ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন সূত্রে যোগাযোগের পর নিশ্চিত হওয়া গেছে, নিখোঁজ চারজনের পরিচয় এখনো পুলিশ বা প্রশাসন শনাক্ত করতে পারেনি। পুড়ে যাওয়া চারটি লাশের ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
একটি পরিবার এভাবে এক নিমেষে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মনিরামপুরের মোহনপুর কারিকরপাড়াজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন ও প্রতিবেশীদের চোখের পানিতে ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সকাল থেকেই স্থানীয় লোকজন ভিড় করছেন নাহিদের গ্রামের বাড়িতে।
মনিরামপুর থানার ওসি আবু সাঈদ জানিয়েছেন, নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। যতটুকু জানা গেছে, নাহিদের পরিবারের লাশ শনাক্ত হয়নি। যে লাশগুলো রয়েছে, সেগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা যাবে না।
নাহিদুর রহমান তুহিনসহ পরিবার নিখোঁজের বিষয়ে পুলিশ জেনেছে বলে জানান, কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পেলে জানতে পারবো।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, টুপটুপ রিসোর্টের কউকের অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। আগে সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা একে একে ১০টি লাশ উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন। আগুন থেকে বাঁচতে কাঠের অবকাঠামোয় নির্মিত রিসোর্টটির শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি চারজন। সেখান থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়।
