জটিল রোগের চিকিৎসায় সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্যানসার, কিডনি ও থাইরয়েডের মতো রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সময়মতো না হলে চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়। অথচ তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের সংকটে দেশের বিভিন্ন নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এতে গুরুতর রোগে আক্রান্ত মানুষ চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। চিকিৎসার মতো জীবন-মরণ প্রশ্নে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে প্রয়োজনীয় আইসোটোপের সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে ক্যানসারের বিস্তার নির্ণয়ে বোন স্ক্যান, কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষায় ডিটিপিএ রেনোগ্রাম এবং থাইরয়েড ও প্যারাথাইরয়েড স্ক্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসের ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে ডিটিপিএ রেনোগ্রামের জন্য প্রায় ২০০ রোগী টাকা জমা দিয়ে অপেক্ষা করছেন। আরও প্রায় ১০০ জন রয়েছেন অপেক্ষমাণ তালিকায়। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার সিরিয়াল ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। এই চিত্র শুধু সরবরাহ সংকটের নয়, বরং রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। আইসোটোপের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ এসব চিকিৎসা উপাদান দীর্ঘ সময় মজুদ করে রাখা যায় না এবং আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সরবরাহে সাময়িক বিরতি থাকলেও তা কাটিয়ে ওঠার প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। এ বছর নির্ধারিত বিরতির সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, বিকল্প ব্যবস্থা ও জরুরি সরবরাহ পরিকল্পনা কতটা কার্যকর ছিল। একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা উপাদানের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব যে সরাসরি রোগীদের ওপর পড়ে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রাখা জরুরি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংকট কবে কাটবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীরা পরীক্ষা করাতে পারছেন না, চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় রয়েছেন, অথচ সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের মতো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এমন নীরবতা গ্রহণযোগ্য নয়। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য গোপন বা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা মানুষের উদ্বেগ বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; বরং জনস্বার্থে দায়িত্ব পালনেরই অংশ।
এ সংকট নিরসনে প্রথমেই আইসোটোপ আমদানির বর্তমান বাধা চিহ্নিত করে দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। প্রয়োজনে সরবরাহকারীর সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং আমদানি প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের কোন কোন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে, কতজন রোগী অপেক্ষায় আছেন এবং কাদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা জরুরি- তার সমন্বিত তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর দীর্ঘদিন অপেক্ষমাণ ও গুরুতর রোগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সংকট এড়াতে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক উৎসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আগাম ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনা গড়ে তোলা জরুরি। চিকিৎসা উপাদানের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সংকটের কারণ, সমাধানের অগ্রগতি ও পরীক্ষাগুলো পুনরায় চালুর সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
আইসোটোপের সংকট কেবল আমদানি বা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবন, চিকিৎসার অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সময়মতো রোগ নির্ণয় না হওয়ায় কোনো রোগীর চিকিৎসা পিছিয়ে পড়ুক, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাই আর কালক্ষেপণ না করে আইসোটোপের সরবরাহ স্বাভাবিক করা, অপেক্ষমাণ রোগীদের পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন সংকট প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। মানুষের জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েই এ সংকটের সমাধান করা জরুরি।
