সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও চট্টগ্রামে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ উঠেছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে ওসি বদলি, পদায়ন পরিবর্তন এমনকি কর্মস্থল ছাড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। গত দুই বছরে নগরীর ১৬ থানায় অন্তত ২০ দফায় ওসি পদে রদবদল এবং শুধু খুলশী থানায় ছয় মাসে পাঁচজন ওসির দায়িত্ব পালনের ঘটনায় পুলিশের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে পেশাগত ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায়ই দায়িত্ব পালন ও বদলি করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বদলি হলে তা পুলিশের পেশাগত স্বাধীনতা ও অপরাধ দমনের কার্যকারিতাকে দুর্বল করতে পারে।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হচ্ছে তাদের। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ। তিনি বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা করে পুলিশ কাজ করে না। অপরাধী
যেই হোক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
অভিযানের পরদিনই ওসির বদলি : নগরীর খুলশী থানার সাবেক ওসি মোহাম্মদ আব্দুর রহিমের বদলির ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে পুলিশ প্রশাসনে। স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তার করতে গত ৬ অক্টোবর রাতে নগর ভবনে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানের সময় নগর ভবনে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সেইদিন গ্রেপ্তার করা যায়নি বগাকে।
অভিযানের পরদিন সকালে সংবাদ সম্মেলন করে ওসি আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগ প্রীতির’ অভিযোগ তোলেন মেয়র। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী বগাকে ১৭-১৮ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মী এবং ‘জুলাই-আগস্টের যোদ্ধা’ বলে দাবি করেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওসি আব্দুর রহিমকে খুলশী থানা থেকে সরিয়ে নগর বিশেষ শাখায় (সিটি এসবি) পদায়ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ৮ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তাকে খুলনা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। ১০ অক্টোবরের মধ্যে সিএমপি থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। এরপর চট্টগ্রাম ছাড়েন তিনি। অর্থাৎ সন্ত্রাসী বগাকে ধরতে যাওয়ার চেষ্টার শাস্তি হিসেবে এক রেঞ্জ থেকে অন্য রেঞ্জে বদলি।
ওয়াকিল হোসেন বগার বিরুদ্ধে শিক্ষককে মারধর, পুলিশের ওপর হামলা, হত্যা, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাং পরিচালনাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। ২২ মামলার আসামিও। এত অভিযোগ ও মামলার পরও বগাকে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মী হিসেবে তুলে ধরায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিবেচনায় নিতে হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হবে।
অভিযানেও চাপ : নগর পুলিশের বাইরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ উঠেছে। রাউজান, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে খুন ও গুলিবর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনায় জেলা পুলিশ অভিযান জোরদার করেছে। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান আরও গতি পায় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
তবে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা বলেন, অতীতে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কিছু সন্ত্রাসী এখন কয়েকজন সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতার আশ্রয়ে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের কারণে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমকেও ‘চট্টগ্রাম ছাড়া’ করার হুমকি দেয় বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে এসপি মাসুদ আলমকে ফোন দিলেও সাড়া মেলেনি।
দুই বছরে ২০ দফায় ওসি বদলি : অভিযানে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগের পাশাপাশি সিএমপিতে ওসি পদে ঘন ঘন রদবদল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত দুই বছরে অন্তত ২০ দফায় নগরীর ১৬ থানায় ওসি পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটবার পরিবর্তন হয়েছে খুলশী থানার ওসি পদে। শুধু গত ছয় মাসেই এ থানায় পাঁচজন ওসি দায়িত্ব পালন করেছেন।
একই থানায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার ওসি পরিবর্তনের ফলে অপরাধ দমন, তদন্তের ধারাবাহিকতা ও স্থানীয় অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কে কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দ-অপছন্দ এবং তাদের সুপারিশও এসব বদলিতে ভূমিকা রাখছে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, রাজনৈতিক চাপের মুখে কোনো ওসি বদলি হয় না। প্রশাসনিক প্রয়োজন, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে ওসি বদলি করা হয়। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং রুটিন কাজ।
পুলিশের দায়িত্ব অপরাধ দমন ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; কিন্তু অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে কর্মকর্তাদের বদলি, পদায়ন কিংবা কর্মস্থল ছাড়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলে মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব পড়তে পারে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক আরিফ উল্লাহ বলেন, প্রশাসনিক প্রয়োজনের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বদলি করা হলে তা ‘বদলির মাধ্যমে পুলিশের রাজনীতিকরণ’ এবং ‘শাস্তিমূলক বদলি’ হিসেবে কাজ করতে পারে। এর প্রভাব অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যেও পড়তে পারে। তারা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নিজেদের পেশাগত পরিণতি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হতে পারেন। অভিযানে বাধা ও হুমকির ঘটনায় ব্যবস্থা না নিলে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং দায়মুক্তির প্রবণতা উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঘন ঘন ওসি বদলের বিষয়ে আরিফ উল্লাহ বলেন, এটা প্রশাসনিক অস্থিরতার লক্ষণ। ঘন ঘন বদলির কারণে তদন্তের ধারাবাহিকতা, স্থানীয় অপরাধ সম্পর্কে কর্মকর্তাদের জ্ঞান এবং জনসম্পর্ক দুর্বল হতে পারে। তার মতে, পুলিশের কার্যগত স্বাধীনতার পাশাপাশি কার্যকর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
