দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পর রাজধানীর বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে তীর, ফ্রেস, পুষ্টি ও রূপচাঁদার মতো পরিচিত ব্র্যান্ডের পাঁচ লিটারের বোতল অনেক দোকানে মিলছে না। এতে পছন্দের ব্র্যান্ডের তেল কিনতে এসে ফিরে যাচ্ছেন ক্রেতারা। কেউ বাধ্য হয়ে বিকল্প ব্র্যান্ডের তেল কিনছেন, কেউ আবার বেশি দামে খোলা তেল কিনছেন। খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তা অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, দাম বাড়ানোর পথ তৈরি করতেই কয়েকটি রিফাইনারি সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা
করছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করে রিফাইনারিদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরবরাহ সংকটের কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে নতুন করে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব ক্রেতাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পরিচিত ব্র্যান্ডের তেল তারা পাচ্ছেন না। ডিলারদের কাছ থেকেও আগের মতো তেল মিলছে না। অন্যদিকে, বাজারে মিজান ও স্টার শিপের মতো বিকল্প ব্র্যান্ডের পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও অনেক ক্রেতা সেগুলো কিনতে আগ্রহী নন। ব্যবসায়ীদের একাংশের অভিযোগ, দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে বড় কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানে পরিচিত ব্র্যান্ডের পাঁচ লিটারের বোতল নেই। কোনো কোনো দোকানে এক ও দুই লিটারের বোতলও পাওয়া যাচ্ছে না। ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার ও যাত্রাবাড়ী এলাকার বিক্রেতারা জানান, ক্রেতারা বিশেষ করে তীর, পুষ্টি ও রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের তেল খোঁজেন। এসব ব্র্যান্ডের সরবরাহ কম থাকায় তাদের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। বিকল্প ব্র্যান্ডের তেল দেখালেও অনেকে তা নিতে চান না। ফলে দোকানে অন্য ব্র্যান্ডের তেল থাকলেও ক্রেতার পছন্দের পণ্য না থাকায় বিক্রি ব্যাহত হচ্ছে।
খুচরা বিক্রেতা রফিক বলেন, ‘মানুষ এসে বলে, ভাই, তীর দেন। আগে কোম্পানি যে পরিমাণ তেল দিত, এখন আর সেভাবে দিচ্ছে না। তাহলে আমরা কীভাবে দেব? মিজান ও স্টার শিপের তেল আছে, কিন্তু সব কাস্টমার এগুলো নিতে চান না। তারা পরিচিত ব্র্যান্ডের তেলই খোঁজেন।’
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ নিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগের মধ্যে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড ভেজিটেবল ফ্যাট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন গত ২০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সচিবকে চিঠি দিয়ে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম আরও ১০ টাকা বাড়াতে চায়।
বর্তমানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা, ৫ লিটার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকা। গত ৩ সেপ্টেম্বর পাঁচ টাকা বাড়িয়ে এ দাম নির্ধারণ করা হয়। এর আগে এপ্রিলের শেষ দিকে চার টাকা বাড়িয়ে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৯ টাকা করা হয়েছিল।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকেই বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে টানাপড়েন দেখা দিতে শুরু করে। এপ্রিলের শেষ দিকে দাম বাড়ানোর পরও জুলাইয়ের দিকে আবার সরবরাহ সংকটের অভিযোগ ওঠে। সেপ্টেম্বরে দাম সমন্বয়ের পর এখন ফের বাজারে তেল কম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পর কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম মোল্লা। তিনি বলেন, বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন তারা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে দাম সমন্বয় না হলে লোকসানের আশঙ্কা থাকে। এ কারণে সরকারের কাছে দাম সমন্বয়ের আবেদন করা হয়েছে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ কমানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, সরকার দাম সমন্বয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকটে ক্রেতাদের একটি অংশ ঝুঁকছেন খোলা তেলের দিকে। তবে এ ক্ষেত্রেও স্বস্তি নেই। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দোকানভেদে দামের পার্থক্য থাকায় ক্রেতাদের দরদাম করে তেল কিনতে হচ্ছে। বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা তেলের মান, উৎস ও দামের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে গেলে খোলা তেলের চাহিদা বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে খোলা তেলের দামের ওপর নজরদারি না থাকলে ক্রেতাদের বাড়তি দামে তেল কিনতে হতে পারে। তাই সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি খোলা তেলের বিক্রয়মূল্য ও মান তদারকি করাও জরুরি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পরই কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এটি তাদের নিয়মিত কৌশল বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, কয়েকটি রিফাইনারির হাতে বাজার কুক্ষিগত থাকায় কার্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। ছোট ব্যবসায়ীদের তেল আমদানির সুযোগ দিয়ে বাজার উন্মুক্ত করা গেলে এ সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এ ছাড়া সরবরাহ কমানোর অভিযোগে রিফাইনারিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে সয়াবিন তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা, আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া, খালাস, বীমা, পরিশোধন ও পরিবহন খরচ বিবেচনা করা হয় বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গত সেপ্টেম্বরে মহাখালীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দেশে ভোজ্যতেলের ব্যবসা মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর। আমদানিকারকরা দীর্ঘদিন লোকসানে থাকলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে; তাই সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ব্যবসায়ীদের লোকসান এড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য রেখে দাম নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তবে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের সঙ্গে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়মিত তদারকি না করলে সাধারণ ভোক্তাদেরই বাড়তি খরচের চাপ নিতে হবে।
শীতের আগে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তাই পরিচিত ব্র্যান্ডের তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, খোলা তেলের দাম ও মান তদারকি এবং সরবরাহে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্রেতারা।
