পুলিশের অকেজো যানবাহনের তালিকাও দীর্ঘ। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৬৪২টি যানবাহন অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ প্রতিরোধ ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের নিয়মিত টহল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহলের মাধ্যমে অপরাধীদের তৎপরতা নজরদারির পাশাপাশি জরুরি ঘটনায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ। তবে তীব্র যানবাহন সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় নিয়মিত টহল, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি ও জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতার পাশাপাশি নাগরিকদের কাছে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি ও জরুরি সেবা পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, পুলিশের অনুমোদিত স্থায়ী সরঞ্জাম তালিকায় মোট যানবাহন রয়েছে ১৬ হাজার ২০০টি। এর মধ্যে ৯ হাজার ৭৮৭টি মোটরসাইকেল হলেও সচল রয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৫০৩টি; অর্থাৎ ৪ হাজার ২৮৪টি সচল নয়। এছাড়া পুলিশের ৬ হাজার ৫৫৮টি যানবাহনের বয়স আট বছরের বেশি। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে এসব যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ছে, পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতাও কমছে। বিশেষ করে থানা ও ফাঁড়িতে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় নিয়মিত টহল, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা জানান, পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় নিয়মিত টহল, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি ও জরুরি ঘটনায় দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রাতে টহল, ছিনতাই-ডাকাতিপ্রবণ এলাকায় অভিযান এবং সন্দেহভাজন অপরাধীদের ধাওয়ার ক্ষেত্রে যানবাহনের স্বল্পতা বড় বাধা। একাধিক এলাকায় একই সময়ে পুলিশি সহায়তার প্রয়োজন হলে সীমিত গাড়ি দিয়ে সব জায়গায় সাড়া দেয়া সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থায় কিংবা হেঁটে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পুরনো যানবাহন মাঝপথে বিকল হলে অভিযান ও টহল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময় ও জনবলও অপচয় হয়। এতে দ্রুত সাড়া দেয়ার সক্ষমতা কমে এবং নাগরিকদের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশের অকেজো যানবাহনের তালিকাও দীর্ঘ। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৩ হাজার ৬৪২টি যানবাহন অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। একই সময়ে নতুন যানবাহন কেনা হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৪৯টি। ফলে অকেজো যানবাহন প্রতিস্থাপনে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
থানাভিত্তিক যানবাহনের চাহিদা পূরণেও বড় সংকট রয়েছে। প্রতিটি থানায় দুটি করে ডাবল কেবিন ও দুটি করে সিঙ্গেল কেবিন পিকআপ প্রয়োজন। বর্তমানে ডাবল কেবিন পিকআপের ঘাটতি ১ হাজার ৩২৮টি এবং সিঙ্গেল কেবিন পিকআপের ২ হাজার ৬৫৬টি। অর্থাৎ দুই ধরনের পিকআপ মিলিয়ে মোট ঘাটতি ৩ হাজার ৯৮৪টি। এ সংকট কাটিয়ে পুলিশের কার্যক্রম গতিশীল রাখতে প্রতি বছর শুধু যানবাহন খাতেই ৩০০-৩৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান, পুরনো যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং নতুন যানবাহন সংগ্রহের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ না হলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্ষমতা বাড়ানো কঠিন হবে। যানবাহন সংকট অব্যাহত থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নাগরিকদের কাছে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি ও সেবা পৌঁছে দেয়ার কার্যক্রমও ব্যাহত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকলে নিয়মিত টহল পরিচালনা, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে অপরাধীরা সুযোগ নিতে পারে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি হতে পারে। পুলিশের কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করতে হলে শুধু জনবল বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে চাহিদার ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ, পুরনো যানবাহন প্রতিস্থাপন এবং সম্পদের যথাযথ ব্যবহারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।’
এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) কামারুম মুনিরা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুলিশের কার্যক্রম গতিশীল রাখা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যানবাহন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুরনো ও অকেজো যানবাহনের পরিবর্তে নতুন যানবাহন সংযোজনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যানবাহন নিশ্চিত করা গেলে টহল কার্যক্রম জোরদার, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়া আরো সহজ হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।’
