তিন মাস ধরে পানির সংকট, ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ায় বিক্ষোভ
চ্যানেল আই অনলাইনপ্রকাশ:
ইন্দোনেশিয়ার বাটাম দ্বীপে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও পরিচালনার কারণে পানির সংকট বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাড়িতে তিন মাস ধরে পানি না পাওয়ার অভিযোগ তুলে সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, বাসিন্দাদের কল শুকিয়ে গেলেও ডেটা সেন্টারের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতে পর্যাপ্ত পানি ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা খালি প্লাস্টিকের বোতল ও পানির জার হাতে ‘পানি চাই, পানি চাই’ স্লোগান দিয়ে নংস্যা ডিজিটাল পার্কের ডেটা সেন্টার এলাকায় জড়ো হন। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা দেউই সুসান্তি বলেন, গত তিন মাস ধরে তাঁদের বাড়ির কল দিয়ে এক ফোঁটা পানিও পড়েনি। ডেটা সেন্টার স্থাপনের আগে পানির সরবরাহ নিয়মিত ছিল। এখন বাকাউ সেরিপ গ্রামের বাসিন্দাদের ট্যাংকারের পানি কিনতে হচ্ছে। সেই পানিও ঘোলা, ময়লাযুক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বাটামের পানি সরবরাহকারী সংস্থা জানিয়েছে, সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত করতে কাজ চলছে। তবে পানির সংকটের সঙ্গে ডেটা সেন্টারগুলোর চাহিদার সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি সংস্থাটি। অন্যদিকে, বাটামের বাণিজ্য ও শিল্প খাত তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থা বিপি বাটাম দীর্ঘস্থায়ী খরাকে সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আবাসিক এলাকার পানি ডেটা সেন্টারে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও নাকচ করেছে তারা।
দ্বীপটির পানির প্রধান উৎস কৃত্রিম জলাধারগুলোতে পানির পরিমাণ কমে আসায় সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বিক্ষোভের পর কর্তৃপক্ষ ডেটা সেন্টার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দেয়। এর মাধ্যমে জলাধারের মিঠাপানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পানির চাহিদা মেটাতে বলা হয়।
নরওয়েজিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক আগুস হাসান বলেন, ইন্দোনেশিয়ায় ডেটা সেন্টারগুলোর পানির ব্যবহার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এসব তথ্যকে বাণিজ্যিক গোপনীয়তার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। তাঁর মতে, ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও পরিচালনায় যুক্তিসংগত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে পানির সংকটে থাকা মানুষ নিজেদের বঞ্চিত মনে করে প্রতিবাদে নামবেন।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা সেন্টার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এসব স্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ডেটা সেন্টারের শব্দ, রাতভর জ্বলে থাকা নিরাপত্তাবাতি এবং পানি ও বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা তাঁদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ডেটা সেন্টারের সার্ভার সচল রাখতে বিপুল বিদ্যুতের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় পানি। যন্ত্রপাতি অতিরিক্ত গরম হওয়া ঠেকাতে ব্যবহৃত বিভিন্ন শীতলীকরণ ব্যবস্থার অনেকগুলোতেই প্রচুর পানি লাগে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণা অনুযায়ী, একটি সাধারণ ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় তিন লাখ গ্যালন পানি ব্যবহার হতে পারে, যা দেশটির প্রায় এক হাজার পরিবারের দৈনিক ব্যবহারের সমান। মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বড় ডেটা সেন্টারে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ২০০ পরিবারের সমপরিমাণ পানি প্রয়োজন হতে পারে। একই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ চাহিদা ২২ হাজার বাড়ির সমান হতে পারে। তবে বাটামের ডেটা সেন্টারগুলোতে ঠিক কত পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রায় ১৩ লাখ মানুষের বাটাম দ্বীপে প্রাকৃতিক মিঠাপানির উৎস নেই বললেই চলে। দ্বীপটি মূলত বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ছয়টি কৃত্রিম জলাধারের ওপর নির্ভরশীল। চলতি বছর পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর পেছনে ঐতিহাসিক মাত্রার শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিবেশবিষয়ক স্থানীয় সংগঠন আকার ভূমি ইন্দোনেশিয়ার সিমুলেশন অনুযায়ী, বৃষ্টি না হলে আগামী এক মাসের মধ্যে নংস্যা জলাধারটি শুকিয়ে যেতে পারে। এই জলাধার থেকেই দেউই সুসান্তির বাকাউ সেরিপ গ্রামে পানি সরবরাহ করা হয়।
দেউই বলেন, পানির সংকটে তাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চাল কেনার জন্য রাখা অর্থ এখন পানি কেনার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে। পানি সংগ্রহের জন্য তাঁর স্বামীকে রাত জেগে অপেক্ষা করতে হয়। এরপর সকালে তাঁকে কাজে যেতে হয়।
বাটামের পানি সরবরাহকারী সংস্থাটি এর আগে জানিয়েছিল, সংকট অব্যাহত থাকলে কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা হবে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ নিয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটি নতুন কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে, বাটামে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। বিপি বাটামের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটিতে ১০টি ডেটা সেন্টার স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি নংস্যা ডিজিটাল পার্কে। দুটি চালু হয়েছে এবং তৃতীয়টির নির্মাণকাজ চলছে। আরও অন্তত ছয়টি প্রকল্পের অনুমোদন পর্যালোচনাধীন রয়েছে।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাটামের ডেটা সেন্টার খাতে বিনিয়োগ ৬৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি অবস্থান, তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলদেশীয় কেব্ল নেটওয়ার্কের সংযোগের কারণে দ্বীপটি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
২০১৯ সালে জমি ও বিদ্যুতের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে সিঙ্গাপুর ডেটা সেন্টার নির্মাণ স্থগিত করেছিল। ২০২২ সালে দক্ষতাসংক্রান্ত নতুন মানদণ্ড চালুর পর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর বিনিয়োগকারীরা বিকল্প গন্তব্য হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার বাটাম ও মালয়েশিয়ার জোহর অঞ্চলকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন।
বাটামে হংকংভিত্তিক বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গাও ক্যাপিটাল ও ইন্দোনেশীয় প্রতিষ্ঠান সিনার প্রিমেরা ১৩ হাজার বর্গমিটার আয়তনের একটি ডেটা সেন্টার গড়ে তুলছে। এপ্রিলে সিঙ্গাপুরের ডেটাওয়ান ইন্দোনেশিয়ার একটি রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার সঙ্গে প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার নির্মাণের চুক্তি করে। এর বিদ্যুৎ চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের সমান। জুনে ডেটাওয়ান, চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া ও অস্ট্রেলীয় এআই স্টার্টআপ ফার্মাস ৩৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি এআই অবকাঠামো প্রকল্পের ঘোষণা দেয়।
সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাটামে ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রায় ১০ লাখ বাড়িতে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব।
তবে দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেউই বেদুক এলাকার বাসিন্দা মারলিন্দা বলেন, কর্তৃপক্ষের উচিত শুধু প্রকল্পের অনুমোদন না দিয়ে সরেজমিনে এসে মানুষের দুর্ভোগ দেখা।
আরেক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের দিকে সরকারের নজর দেওয়া উচিত। মানুষকে দুর্ভোগে রেখে বিপুল বিনিয়োগের প্রকল্প বাস্তবায়ন তাঁরা চান না। তাঁদের দাবি, বাড়তি কোনো সুবিধা নয়, শুধু বাড়িতে নিয়মিত পানির সরবরাহ ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
