ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন রায়হান (ছদ্মনাম)। আগে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে তাঁর চার ঘণ্টার মতো সময় লাগত। তথ্য খোঁজা, বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রয়োজনীয় উপাত্ত সংগ্রহ, খসড়া তৈরি ও সম্পাদনা—সব মিলিয়ে বেশ সময় চলে যেত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তায় একই কাজ এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ করতে পারেন তিনি।
কিন্তু তাতে রায়হানের কাজের চাপ কমেনি। বরং বাকি তিন ঘণ্টায় তাঁকে আরও দুটি প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়, নতুন কিছু দায়িত্বও সামলাতে হয়। দিন শেষে আগের মতোই ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।
রায়হানের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—প্রযুক্তি যদি কম সময়ে বেশি কাজ করার সুযোগ দেয়, তাহলে মানুষের হাতে অবসর সময় বাড়ছে না কেন? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সত্যিই কাজ সহজ করছে, নাকি একই সময়ে আরও বেশি কাজ করার প্রত্যাশা তৈরি করছে?
এআই নিয়ে আশাবাদীদের ধারণা, এই প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের চাপ কমাবে এবং কর্মীদের ব্যক্তিগত জীবনের জন্য আরও সময় তৈরি করবে। তবে বাস্তবে উৎপাদনশীলতা বাড়লেই যে কাজের সময় কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং কিছু ক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব ও কাজের পরিমাণও বেড়ে যেতে পারে।
প্রযুক্তি বদলেছে, কমেনি কাজের সময়
প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের কাজের সময় অনেক কমিয়ে দেবে, এমন আশা আজকের নয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৯৩০-এর দশকে প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে একসময় মানুষের কর্মসপ্তাহ নেমে আসতে পারে মাত্র ১৫ ঘণ্টায়।
কেইনসের ধারণা ছিল, উৎপাদনশীলতা বাড়ার সঙ্গে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সহজ হবে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে কাজের অভাব নয়, বরং বাড়তি অবসর সময় কীভাবে কাটানো যায়, তা নির্ধারণ করা।
কিন্তু বাস্তবতা তাঁর পূর্বাভাসের সঙ্গে মেলেনি। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি সত্ত্বেও অনেক দেশের মানুষকে এখনো সপ্তাহে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়।
এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। প্রযুক্তির সাহায্যে কম সময়ে বেশি কাজ করা সম্ভব হলেও সেই সময়টুকু কর্মীদের বিশ্রামের জন্য ছেড়ে না দিয়ে নতুন দায়িত্বে ব্যবহার করা হতে পারে।
প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারকারী কর্মীরা দ্রুত কাজ শেষ করার পাশাপাশি আগের চেয়ে বেশি ধরনের দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং দীর্ঘ সময় কাজ করছেন। ২০০ কর্মীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় এমন প্রবণতা দেখা গেছে।
তথ্য বেশি হলেই কি সুবিধা বাড়ে
এআইয়ের একটি বড় সুবিধা হলো, এটি বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত খুঁজে বের করা, সংক্ষেপ করা এবং প্রয়োজনীয় বিষয় আলাদা করতে সাহায্য করতে করে। কিন্তু একই প্রযুক্তি খুব সহজে বিপুল পরিমাণ নতুন তথ্য ও কনটেন্ট তৈরির সুযোগও করে দিচ্ছে। ফলে তথ্যের প্রাচুর্য কখনো কখনো নতুন সমস্যার কারণ হতে পারে।
গবেষক মিরিয়াম আর্নল্ড ও তাঁর সহকর্মীরা ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক আলোচনায় উল্লেখ করেন, প্রতি দুই দিনে তৈরি হওয়া তথ্যের পরিমাণ মানবসভ্যতার সূচনা থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তৈরি হওয়া তথ্যের মোট পরিমাণের প্রায় সমান। এটি তথ্যের দ্রুত বৃদ্ধির প্রবণতা বোঝাতে ব্যবহৃত একটি বহুল আলোচিত হিসাব। তবে এর সুনির্দিষ্ট পরিমাপ ও বর্তমান প্রযোজ্যতা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
এআইয়ের সাহায্যে কনটেন্ট তৈরি সহজ হওয়ায় তথ্যের এই প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। কিন্তু মানুষের পক্ষে সব তথ্য পড়া, বোঝা ও যাচাই করা সম্ভব নয়।
ধরা যাক, হৃদ্রোগের একটি বিশেষ শাখায় কাজ করা নতুন একজন চিকিৎসককে নিজের ক্ষেত্রের সব গবেষণার সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। এ বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণাপত্র পড়ার জন্য তিনি যদি দিনের পুরো সময় ব্যয় করেন, তবু বিদ্যমান গবেষণাগুলো পড়ে শেষ করতে তাঁর প্রায় ১১ বছর ৪ মাস লাগতে পারে। এর মধ্যে নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতে থাকবে। ফলে পড়া শেষ করেও তিনি হালনাগাদ তথ্যের তুলনায় পিছিয়ে থাকবেন।
এই উদাহরণটি দেখায়, তথ্যের পরিমাণ যত দ্রুত বাড়ে, তা সামাল দেওয়ার কাজও তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘ইনফরমেশন ওভারলোড’ বা তথ্যের অতিরিক্ত চাপ। যখন তথ্যের পরিমাণ এত বেড়ে যায় যে তা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া বা কাজ এগিয়ে নেওয়ার বদলে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের কথাই ধরা যাক। একজন সংবাদকর্মীকে প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিও ও নথি দেখতে হয়। এআইয়ের সাহায্যে এসব তথ্যের সারাংশ তৈরি করা বা প্রাসঙ্গিক অংশ খুঁজে বের করা সহজ হয়। কিন্তু একই সঙ্গে যদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এআই দিয়ে আরও বেশি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, প্রতিবেদন ও প্রচারমূলক লেখা তৈরি করতে থাকে, তাহলে সেগুলো যাচাই ও সম্পাদনার কাজও বাড়বে।
অর্থাৎ তথ্য সংক্ষেপ করার সুবিধা যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি তথ্যের স্রোত সামলানোর নতুন দায়িত্বও তৈরি হতে পারে।
বেশি কাজ, নাকি বেশি কার্যকর কাজ?
এআই ব্যবহার করে কোনো কাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হলে সেটি নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক। কিন্তু কাজের পরিমাণ বাড়লেই যে কাজের মান বা উপযোগিতা বাড়বে, তা নয়।
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী এআই ব্যবহার করে এক দিনে ১০টি প্রতিবেদন তৈরি করতে পারছেন। আগে হয়তো তিনি চারটি প্রতিবেদন তৈরি করতেন। সংখ্যার হিসাবে তাঁর উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। কিন্তু নতুন প্রতিবেদনগুলোর তথ্য সঠিক কি না, বিশ্লেষণ যথেষ্ট গভীর কি না, কিংবা সেগুলো পাঠক বা প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগছে কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
এআই দিয়ে তৈরি কোনো লেখা ওপর থেকে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও তাতে প্রয়োজনীয় তথ্য, গভীরতা বা বিশ্লেষণের ঘাটতি থাকতে পারে। এ ধরনের কাজকে ইংরেজিতে ‘ওয়ার্কস্লপ’ বলা হয়। অর্থাৎ এমন কাজ যা দেখতে মোটামুটি ঠিকঠাক, কিন্তু বাস্তবে কোনো সমস্যার সমাধান বা কাজের অগ্রগতিতে খুব বেশি অবদান রাখে না। এ ধরনের লেখা বা প্রতিবেদন যাচাই, সংশোধন কিংবা নতুন করে তৈরির প্রয়োজন হলে অন্য কর্মীদের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে একজনের কাজ দ্রুত করার সুবিধা পুরো দলের জন্য বাড়তি কাজের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে এআই দিয়ে দ্রুত একটি প্রতিবেদন তৈরি হলো। কিন্তু তাতে ভুল তথ্য থাকলে, সম্পাদক বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে সেটি যাচাই করতে হবে। প্রয়োজন হলে তথ্যের উৎস খুঁজতে হবে, ভুল সংশোধন করতে হবে এবং আবার সম্পাদনা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে সময় বাঁচলেও পুরো কাজ শেষ করতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে।
তাই এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু কত দ্রুত বা কত বেশি কাজ করা গেল, সেটিই বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়। কাজটি কতটা নির্ভুল, প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কখনো কখনো অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট কম তৈরি করাই উৎপাদনশীলতার ভালো উদাহরণ হতে পারে।
