ঢাকা: আগের স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও হুবহু সেই পথে হাঁটছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেছেন, সাত মাসেই রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) উদ্যোগে ‘জুলাই সনদের ১ বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি জনগণকে মূর্খ মনে করে এবং অবমূল্যায়ন করে। তারা নিজেদেরই শুধু জ্ঞানী মনে করে। প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে হাত দিয়েছে তারা।’ এবার সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা মেধার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলনে নেমেছিলেন। রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরিতে পিএসসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একের পর এক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন পিএসসিতে হাত দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক সরকারের প্রভাব খাটিয়ে কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগ করতে বলা হচ্ছে।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, কোনো মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা নয়।’ চাকরির গুরুত্বপূর্ণ এই ক্ষেত্রকে দলীয় ক্যাডার দিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘উন্নয়ন কোনো দলের নিজস্ব তহবিল নয়’
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, ‘যেসব এলাকার মানুষ বিএনপিকে ভোট দেয়নি বা দেবে না, সেসব এলাকায় বরাদ্দ না দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।’ রাষ্ট্রপতির রংপুরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে জীবন দেওয়া আবু সাঈদের এলাকায় গিয়ে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হওয়া করের টাকায় শিশু থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অবদান রয়েছে। কেউ প্রত্যক্ষ কর দেন, কেউ পরোক্ষ কর দেন। রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের সম্মিলিত সম্পদ। কোনো এলাকার মানুষ কাকে ভোট দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে না।’
এ ধরনের বক্তব্যকে অশালীন আখ্যা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় অর্থ কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব তহবিল নয়।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘সরকারি দলের ২০০ সংসদ সদস্যের আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিরোধী দলের কোনো সংসদ সদস্যকে সেই বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।’ এমন বৈষম্যের অবসান ঘটাতেই ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় আদায়ের ঘোষণা
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল বস্তাপচা রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করা। কিন্তু দেশকে আবারও পুরোনো ধারায় ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল কি গালে আঙুল দিয়ে বসে থাকবে?’ নানা অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেও জনগণ তাদের যে আসন দিয়েছে, সেই আসনের ৮৯ জন সংসদ সদস্য ১৮ কোটি মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করবেন বলে ঘোষণা দেন তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বিএনপি পরিবর্তিত হলেও তারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করবেন না। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করেই ছাড়বেন। এ জন্য নানা প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল লক্ষ্য অর্জনে অটল থাকবে।’
তিনি জানান, তাদের আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট দলের জন্য নয়; জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতেই এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
‘জ্বালাও-পোড়াও আমাদের কর্মসূচি নয়’
আন্দোলনের ধরন তুলে ধরে জামায়াত আমির জানান, তারা দেশকে ভালোবাসেন এবং জ্বালাও-পোড়াও তাদের আন্দোলনের কর্মসূচি নয়। ২০২৪ সালের আন্দোলন প্রমাণ করেছে, খালি হাতে দেশপ্রেম ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েও ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো সম্ভব। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তারা এগিয়ে যাবেন এবং নব্য ফ্যাসিবাদের পতন ঘটবে বলে আশা করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিএনপির পতন চাইনি; বরং দলটির সফলতা চেয়েছিলাম, কারণ বিএনপির সফলতা মানে দেশের সফলতা।’ সরকার ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থে বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়েও সমালোচনা
বিএনপির ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, ‘বাস্তবে দলের নেতারা নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি ও জনস্বার্থ কোনো সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হবে না।’
যুবসমাজ জেগে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পূর্ণমুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তারা থামবে না।’ যুবকদের সঙ্গে নিয়ে আরও শক্তিশালীভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
এবি পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এমপি এবং এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ অন্য নেতারা।
