লক্ষ্মীলাভে বাঙালি আজ কতটা এগিয়ে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন ব্যবসায় অনেক বাঙালি নিজগুণে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। সেই সব উদ্যোগী মানুষের মধ্যে অন্যতম হলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার। তাঁরই উদ্যোগে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা ‘নিউ থিয়েটার্স’। মূলত এই সংস্থার হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের প্রকৃত প্রসার শুরু এবং একই সঙ্গে লক্ষ্মীলাভেরও। বাংলা সিনেমার তথাকথিত ‘স্বর্ণযুগ’-এর পিছনে এই সংস্থার প্রাণপুরুষ বীরেন্দ্রনাথ ও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত শিল্পী-কলাকুশলীদের অবদান অনস্বীকার্য। ত্রিশের দশকে প্রতিষ্ঠিত নিউ থিয়েটার্সের তৈরি ছবি সারা ভারতের কাছেই ছিল দৃষ্টান্ত। চল্লিশ থেকে শুরু করে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিউ থিয়েটার্সের বহু বাংলা ছবির পরে হিন্দি সংস্করণ হয়েছে, এই কলকাতাতেই, অধিকাংশ বাংলা শিল্পীদের নিয়েই। নিউ থিয়েটার্সের সাফল্যের ফসলই পরবর্তী ষাট-সত্তর দশকের বাংলা সিনেমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
সেই টালিগঞ্জ, সেই বাংলা ছবির জগতে অনেক বদল ঘটে গিয়েছে আজ। ইন্ডাস্ট্রির অন্দরেই অনেকে অভিযোগ করেন, নানা কারণে বাংলা ছবির জগৎ আজ ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে লক্ষ্মীলাভ, অর্থাৎ অর্থনৈতিক সাফল্যের নিরিখে। এখানে বিনিয়োগ কম, সাফল্যও কম। আবার অনেকে মনে করেন, অর্থনীতিটা আপেক্ষিক। তাঁদের বক্তব্য, সাফল্যের পিছনে থাকে ভাল গল্প, চলমান সামাজিক সমস্যা তুলে ধরা, সাধারণ মানুষের কথা বলা, ক্ষমতাকে তুষ্ট না করার সাহস। তা হলে আরও বেশি দর্শক আগ্রহী হবেন, আরও লক্ষ্মীলাভ সম্ভব। আবার কারও মতে ওটিটি বা সমাজমাধ্যমের যুগে দর্শকও প্রেক্ষাগৃহ থেকে মুখ ফিরিয়েছেন। কেউ মনে করেন, প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। কিন্তু ব্যাপারটা কি আদৌ এত সরল? কী মনে করেন টলিউডের প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একটা অংশ? শুনল আনন্দবাজার ডট কম।
বাংলা ছবিতে বাজেটের আলোচনা হলেই বরাবর অনিবার্য ভাবে এসে পড়ে বলিউড ও দক্ষিণের ইন্ডাস্ট্রির তুলনা। তবে সেই তুলনাটা অন্যায্য বলে অনেকেই মনে করেন। কলকাতার প্রযোজক অতনু রায়চৌধুরীই যেমন মনে করেন যে, এ হেন তুলনা ‘দুঃসাহসিক’। তাঁর কথায়, “বলিউড বা দক্ষিণের মতো খরচ করে এখানে সিনেমা করাটা দুঃসাহসিক পদক্ষেপ হয়ে যাবে। এখানে প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা এতই কম, যে আয়ও কম। হঠাৎ করে ৫০ কোটি টাকা বাজেটের সিনেমা বানালেই তো আর চলে না।” প্রযোজক হিসাবে একই মত নন্দিতা রায়ের। তিনি বলেন, “এখানে বিশালাকার ‘ওভার দ্য টপ’ ছবি তৈরির সাহস করেন না কেউ। কারণ, সেই টাকাটা ফেরত আনার রাস্তা কম। একটি তামিল ছবি তৈরি হলে, সেটা মলয়ালিরাও দেখবেন, কন্নড় দর্শকও দেখবেন, অন্ধ্রপ্রদেশের লোকেও দেখবেন— পুরো দক্ষিণ ভারতে ছবিটা ছড়ায়। অনেক বেশি দর্শক, অনেক বেশি সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহে ছবিটা পৌঁছোয়।” পুজোয় তাঁর নতুন ছবি ‘বহুরূপী: দ্য গোল্ডেন ডাকু’ মুক্তি পেয়েছে। নন্দিতা জানাচ্ছেন, দেশ জুড়ে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেক্ষাগৃহ অনেক কম পেয়েছেন তাঁরা। সবাই ‘রামায়ণ’ মুক্তির অপেক্ষায়।
‘বলিউড বা দক্ষিণের মতো খরচ করে এখানে সিনেমা করাটা দুঃসাহসিক পদক্ষেপ হয়ে যাবে।’ ছবি: সংগৃহীত।
তা হলে কি সাফল্যের ক্ষেত্রে রাজ্যের সীমিত বাংলা দর্শক কি একটা বাধা? নন্দিতা তা মনে করেন না। তিনি বলেন, “বাঙালি সর্বত্র রয়েছেন। দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু সব জায়গায় বাঙালি আছেন। তা সত্ত্বেও আমাদের ছবি জায়গা পায় না। অনেক দূরের প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার উৎসাহ বাঙালির মধ্যে নেই। কারণ তাঁরা জানেন, ক’দিন পরেই ওটিটিতে ছবিটা এসে গেলে দেখা নেওয়া যাবে। ফলে আয় হবে কী করে, টাকা না উঠলে পরের প্রজেক্ট করব কী করে?” ইন্ডাস্ট্রিতে কোনও খামতি আছে বলে মনে করেন না অতনুও। তিনি বলেন, “আমরা যে বাজেটে ছবি তৈরি করছি, সেটা ঠিকঠাক হলে লক্ষ্মীলাভ হয়। তার প্রমাণ, এ বছরই দুর্গাপুজোয় মুক্তি পাওয়া ছবি রমরম করে চলেছে। ভাল ছবি মানুষজন অবশ্যই দেখবেন। পারিবারিক বাংলা ছবি অন্য ভাষার লোকেরাও দেখেন।”
‘দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু সব জায়গায় বাঙালি আছেন। তা সত্ত্বেও আমাদের ছবি জায়গা পায় না।’ ছবি: সংগৃহীত।
“টলিউডে সমৃদ্ধি আনতে হলে প্রেক্ষাগৃহ বাড়াতে হবে। সিনেমা যদি দেখানোর মতো লোকই না পাই, যদি প্রেক্ষাগৃহই না পাই, তা হলে তো লাভ নেই। আমার মনে হয়, ইন্ডাস্ট্রির শ্রী ফেরাতে প্রথমেই নজর দিতে হবে প্রেক্ষাগৃহ বাড়ানোর দিকে,” মত অতনুর। একই কথা নন্দিতারও। পরিচালক-প্রযোজকের আরও বক্তব্য, “জাতীয় স্তরে ছবির প্রচারও ভাল হওয়া প্রয়োজন। দক্ষিণের মানুষ তাঁদের ভাষার প্রতি অনুগত, যেটা বাঙালিরা নন। আমার ভাষায় ছবি মুক্তি পেলে আমি দেখবই— এই চিন্তাধারাটা বাঙালির নেই। আমাদেরও তাই নিয়মিত ভাল কাজ করে যেতে হবে।”
বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বাজার সীমিত বলে প্রযোজকের বাজেটেও কৃপণতা থাকে। মনে করেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “বাজেট সমস্যা যতদিন না মার্কেট বড় হবে, সেটা থাকবেই। স্যাটেলাইট আর ডিজিটাল মার্কেটের উন্নতি যতক্ষণ না হচ্ছে এই সমস্যা থাকবেই। কিন্তু সেটার সঙ্গে লড়াই করার উপায়ও আছে। এখন অনেক ছবি চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তি পায়, তাতে নির্দিষ্ট সংখ্যক লোক আসেন। যেমন, ‘এম্পারর ভার্সেস শরৎচন্দ্র’-এর ক্ষেত্রে পুজোর যে জনজোয়ার আর তার সঙ্গে ডিজিটাল, স্যাটেলাইট মিলিয়ে মোটামুটি বাজেট উঠে এসেছে। দেড়-দু’কোটি টাকার বাজেট হলে এতে উঠে আসে।” কিন্তু এই বাজেটে পিরিয়ড ছবি করা যায়? তিনি বলেন, “একটু কঠিন। তবে এআই এসে যাওয়ায় সেই চ্যালেঞ্জও আমরা নিতে শুরু করেছি। এ ভাবেই বাজেটের প্রতিকূলতা পেরিয়ে পিরিয়ড ছবি বা ঐতিহাসিক ছবি বানাতে হবে বড়পর্দার জন্য।”
‘যতদিন না মার্কেট বড় হবে, বাজেট নিয়ে সমস্যা থাকবেই।’ ছবি: সংগৃহীত।
অন্য দিকে, পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, টলিউডে প্রযোজকের সংখ্যাই খুব কম। তিনি বললেন, “বলিউড বা দক্ষিণে যত প্রযোজক আছেন, আমাদের টলিউডে অত প্রযোজকই নেই। আমাদের হাতেগোনা ৫-৬ জন প্রযোজকের মধ্যে নিয়মিত কাজ করছেন ৩-৪ জন। মুশকিল হচ্ছে, এই কয়েক জন প্রযোজক নিয়ে আর কত দূর লড়াই করা যেতে পারে? ‘একেন’কে এর বাইরে রাখছি, কারণ সময় নিয়ে একটা ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি তৈরি করতে পেরেছি যা গত কয়েক বছর ধরে ফল দিচ্ছে সিনেমায়। কিন্তু, সব ছবি তো ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি হবে না। বড় প্রযোজক বা বিশাল লগ্নি করার মতো কেউ না থাকলে, ভাল করে ছবি তৈরি করা তো কঠিন। সে ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই হোঁচট খাই।”
অর্থাৎ, জয়দীপের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, লক্ষ্মীই লক্ষ্মীকে টেনে আনবে। মানে, বড় অঙ্কের লগ্নি বেশি হলে পরিচালকেরাও বড় মাপের ছবি করার সাহস পাবেন। তা হলে কিছুটা হলেও ‘ধুরন্ধর’ বা ‘রামায়ণ’-এর মতো হিন্দি ছবির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া হয়তো সম্ভব। তবে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা জয়দীপ বললেন, “প্রযোজকদেরও সিনেমা নিয়ে, সিনেমার ব্যবসা নিয়ে সাধারণ পড়াশোনা থাকা প্রয়োজন। অনেকেই জেনে আসেন বা এসে শেখেন। কিন্তু অনেকেই টাকা আছে বলে লগ্নি করেন, কিছু না জেনেই। ফলে তার পরে যখনই ধাক্কা খান, সেই প্রযোজক ইন্ডাস্ট্রি থেকে একেবারে হারিয়ে যান। তবে তাঁদেরকে গাইড করার দায়িত্ব আমাদেরও। কিন্তু সেও খুব সহজ কাজ নয়।” সৃজিত অবশ্য বলেন, “বাজেট বেশি হলে পুজোর সময়ে সেই ছবি রিলিজ় করানোর চেষ্টা করি, যাতে বাজেট তুলতে সুবিধা হয়। তবে পরিচালক হিসাবে আমার কাজ গল্প বলা, আমি সেটাই বলি। বাকিটা প্রযোজক ও পরিবেশকেরা ঠিক করেন।”
‘বলিউড বা দক্ষিণে যত প্রযোজক আছেন, আমাদের টলিউডে অত প্রযোজকই নেই।’ ছবি: সংগৃহীত।
টলিউডের লক্ষ্মীলাভের পথে আর কী কী খামতি আছে? সৃজিতের কথায়, “বাজার বাড়াতে হবে। সিনেমা দেখার অভ্যাস বাড়াতে হবে। নানা ধরনের ছবি তৈরির ক্ষেত্রে উদ্যোগী হতে হবে। বাণিজ্যিক ছবি আরও বাড়াতে হবে। সিঙ্গল স্ক্রিনগুলো খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। বাজার বাড়লেই হবে লক্ষ্মীলাভ।” তবে জয়দীপ মনে করেন না যে, খামতির পিছনে সিঙ্গল স্ক্রিনের দোহাই দেওয়া যায় সব সময়। তাঁর কথায়, “সিঙ্গল স্ক্রিন কমে গিয়েছে ছবি চলে না বলে নয়। আমার মনে হয়, পরবর্তী প্রজন্মের অনীহাতেই সেই ব্যবসা কমেছে। হয়তো যাঁর সিঙ্গল স্ক্রিন ছিল, সেই মালিকের পরের প্রজন্ম অন্য ব্যবসায় চলে গিয়েছেন। ফলে প্রেক্ষাগৃহ চালাবে কে? সেই দোহাই দিয়ে সিনেমা চলছে না বললে চলবে না। অনেক ছোট ছোট প্রেক্ষাগৃহ তৈরি হচ্ছে, আরও হবে।” তবে তিনিও মনে করেন, ভাল সিনেমা তৈরি হলে দর্শক ঠিকই আসবেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনার দায়িত্বও সামলান অঙ্কুশ হাজরা। এই প্রসঙ্গে তিনি মনে করেন, যে কোনও উৎসবে সকলে মিলে ‘লড়াই’ না করলেই ভাল। একসঙ্গে একাধিক ছবি পুজোয় মুক্তি দেওয়ার প্রবণতা ইন্ডাস্ট্রির পক্ষে মোটেই স্বাস্থ্যকর নয় বলেই মনে করেন অভিনেতা কৌশিক সেনও। তবে এখানে বাজেটের সীমাবদ্ধতা আছে, তা মানেন কৌশিক, অঙ্কুশ দু’জনেই। একই মত অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তেরও। ঋতুপর্ণার কথায়, “আমাদের একাধিক সীমাবদ্ধতা আছে। আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা, প্রেক্ষাগৃহের সীমাবদ্ধতা। পশ্চিমবঙ্গে কাজের পরিধি সীমাবদ্ধ, ফলে বাজেটও সেই অনুযায়ী রাখতে হয়।” কৌশিক বললেন, “সিনেমাটা খুব খরচসাপেক্ষ মাধ্যম। সিনেমায় প্রত্যক্ষ সত্যের ব্যাপার থাকে। ফলে খরচের বিষয়টা সত্যিই জরুরি এ ক্ষেত্রে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে কম বাজেট বাংলা সিনেমাকে অনেকটাই পিছিয়ে দিচ্ছে। এটা সত্যিই যে আমরা হিন্দি বা দক্ষিণী ছবির থেকে অনেক কম বাজেটে কাজ করি। তা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই।” অঙ্কুশের বক্তব্য, “যতক্ষণ না ঠিকঠাক আয় হচ্ছে, ততক্ষণ বেশি লগ্নি করতে মানুষ দু’বার ভাববেন। আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা বাজেট হলে তা-ও ঠিক আছে। ছয় বা সাড়ে ছয় কোটি বাজেট হয়ে গেলেই খুব চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যে লাভ হয়, সেটাও খুব আনন্দদায়ক নয়। যতক্ষণ না একটা নিয়মিত আয় তৈরি করতে পারছে এই ইন্ডাস্ট্রি, ততক্ষণ বড় বাজেটের ছবি বানাতে তো ভয় পাবেনই লোকে।”
‘পশ্চিমবঙ্গে কাজের পরিধি সীমাবদ্ধ, ফলে বাজেটও সেই অনুযায়ী রাখতে হয়।’ ছবি: সংগৃহীত।
তবে ঋতুপর্ণার কথায়, মানুষের প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার অভ্যাসও কমছে। তিনি বলেন, “প্রেক্ষাগৃহ এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের থেকে যে আয়ের পরিমাণ, তা বাজেটের নিরিখে দারুণ নয়। ফলে বড় বাজেটের কাজ হলে, তা আয়ের মাধ্যমে তোলাটা অনিশ্চয়তার দিকে চলে যায়। সিনেমা হিট করছে না, এমন নয়। কিন্তু বাংলা সিনেমা দেখার জন্য আরও মানুষের ঢল নামা দরকার। যেটা আগে ছিল। মানুষ হয়তো আজকাল অনেক সহজলভ্য উপায়ে ছবি দেখে নিচ্ছেন। প্রেক্ষাগৃহে যাওয়ার সেই তাগিদটা এখন নেই। সমাজ, জীবনযাত্রা সবই অনেক বদলে গিয়েছে, প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়ে গিয়েছে। ফলে আগে যেমন সকলে মিলে সিনেমা দেখার একটা ব্যাপার ছিল, তাতে টিকিট বিক্রি ভাল হত। সেই জায়গায় আমরা ধাক্কা খাচ্ছি।”
বাংলা ছবির উন্নতির পথে অর্থাভাবই মূল বাধা— এই বহুচর্চিত যুক্তি পুরোপুরি মানেন না কৌশিক সেন। তিনি মনে করেন, অর্থের থেকেও বাংলা ছবির মূল সঙ্কট হচ্ছে, নান্দনিক বোধ ও স্বার্থের দৈন্য। কৌশিকের কথায়, “বাংলা ছবির দর্শক চিরকালই সীমিত। সেই নিরিখে হিন্দি বা দক্ষিণী ছবির সঙ্গে কোনও দিন বাংলা ছবি পেরে ওঠেনি। তবে বাংলা ছবি উৎকর্ষের কারণে বাকিদের ছাপিয়ে যেত। সবটা অর্থনির্ভর নয়। সেখানে ভাবনাচিন্তা, বিষয়বস্তু, পরিচালনা, অভিনয়, সমকালীন সমাজকে সম্পৃক্ত করা হত যে সাধারণ মানুষ একাত্ম বোধ করত।” তিনি বলে চলেন, “আমার যদি মনে হয়, আমি যেটা করছি সেটাই সঠিক এবং দারুণ— তা হলে সমস্যা। কোনও এক জন মানুষের মাথা থেকে একটা দারুণ চিত্রনাট্য বেরোতে পারে না। সেটা অনেকের কাজ। যে কারণে বলিউডে বা দক্ষিণে পরিচালক বা চিত্রনাট্যকারের দল থাকে। যাঁরা সম্মিলিত ভাবে একটা গল্পকে ভাবেন।”
‘আমার যদি মনে হয়, আমি যেটা করছি সেটাই সঠিক এবং দারুণ— তা হলে সমস্যা।’ ছবি: সংগৃহীত।
অঙ্কুশের কথায়, “বাঙালিরা ভাল গল্প বলতে পারে। কিন্তু, এখানে অন্যান্য ভাষার ছবির প্রভাবও এত বেশি যে, লড়াইটা বেশি। তাও এখানে যা পর্দার সংখ্যা, সেই অনুযায়ী আয় হচ্ছে। এটাও ভাল ইঙ্গিত।” তবে তিনি উৎসবের মরসুমে একসঙ্গে ছবিমুক্তির ‘প্রতিযোগিতা’র বিরোধী। অঙ্কুশের বক্তব্য, “এত ছবি একসঙ্গে মুক্তি দেওয়া উচিত নয়। এগুলো কমিটি তৈরি করে হয় না, এগুলির জন্য নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া থাকা উচিত। একটা বা দুটো ছবি মুক্তি পেলে যা আয় হত প্রযোজকের, নিশ্চিন্তে তিনি সময় নিয়ে পরের ছবিতে হাত দিতে পারতেন। ফলে তার নিরাপত্তাহীনতা থাকত না। কিন্তু, একসঙ্গে চারটে ছবি মুক্তি পেলে সেই লাভের পরিমাণ তো ভাগ হয়ে যাচ্ছে। তা হলে এক এক জনের ভাগে আর কতই বা থাকে? এর ফলে স্যাটেলাইট ডিজিটালও সেই সকল ছবিগুলিকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ করে নেয়। বড়দিনেও একই ঘটনা ঘটে। আমরা কেউ-ই কাউকে জায়গা করে দিই না। কেউ কাউকে বিশ্বাসও করি না। এ ভাবে ইন্ডাস্ট্রি বাড়বে কী করে?” প্রায় একই মত কৌশিকেরও। তিনি বলেন, “পুজোর সময়ে ছবিমুক্তি নিয়ে যে লড়াই, মান-অভিমান, উৎকণ্ঠা চলে, তা কোথাও গিয়ে প্রমাণ করে যে, আমাদের মধ্যে নির্মাতা হিসাবে আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। বছরের অন্য সময়ে মুক্তি পেলে ব্যবসা করতে পারবে না ছবি, এটাই যেন মনে করেন সকলে। আমার কাছে সেটা খুব ভাল বার্তা নয়। গত বছর পর্যন্ত এই নিয়ে যে কুৎসিত দ্বন্দ্ব চলেছে, সেটা এই বছরে তেমন দেখা যায়নি। তবে ভিতরে ভিতরে তো একটা আলোচনা থাকেই— এতে যে আত্মক্ষয় হয়, সেটা ভাল নয়।”
‘এত ছবি একসঙ্গে মুক্তি দেওয়া উচিত নয়।’ ছবি: সংগৃহীত।
তা হলে টলিউডে লক্ষ্মীর ভাঁড়ার উপচে পড়বে কোন পথে? কোনও উপায় জানা আছে কি? ঋতুপর্ণার কথায়, “বাইরের প্রযোজকদের আসতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি আরও বড় হতে হবে। ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে যে ছোটখাটো সমস্যা আছে, সেগুলির সমাধান প্রয়োজন। যেটা অনেকটা ঠিক হয়েছে যদিও। বড় কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজকদের নমনীয় হতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিকে ভালবেসে লগ্নি করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। এটা উর্বর একটা ইন্ডাস্ট্রি। সরকারি সাহায্য, প্রেক্ষাগৃহ ও থিয়েটারের সংখ্যা বাড়ানো গেলে মানুষের কাছে পৌঁছোনো যাবে আরও বেশি।”
কৌশিকও মনে করেন, “টাকার চিন্তা তো আছেই। কিন্তু, আমরা সকলে আদতে শিল্পী। ফলে শিল্পী হিসাবে আত্মমর্যাদা যতদিন না বুঝব, ততদিন দর্শকও আমাদের সম্মান করবেন না।” তিনি মনে করেন, মানসিক সঙ্কীর্ণতা থেকে বেরোতে পারলে ইন্ডাস্ট্রির উন্নতি হবে। ছবি ভাল না মন্দ, সেই বিচার দর্শক করুন। দর্শকই তো প্রকৃত লক্ষ্মী!
