কালবেলা · দেশ
উত্তর কাট্টলীর ‘রিপু রজনী’ দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থী
২১/১০/২০২৬

দেবীদর্শনের জন্য ৩ ঘণ্টার অপেক্ষা। তবু ক্লান্তি নয়, মণ্ডপ দেখে বেরিয়ে মুখে তৃপ্তির হাসি। কেউ এসেছেন খুলনা থেকে, কেউ যশোর বা টাঙ্গাইল থেকে। কেউবা কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী কিংবা মিরসরাই থেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা একটি পূজামণ্ডপের ভিডিও তাদের মনে কৌতূহল তৈরি করেছিল। সেই কৌতূহল থেকেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলীতে আসা।
মণ্ডপে ঢুকে দেখা গেল, প্রচলিত মাটির প্রতিমার বদলে ধাতব উপাদানে গড়া দেবী দুর্গা। চারপাশে আয়না, নীল লেজার আলো আর কৃত্রিম কুয়াশার আবহ। আলো-অন্ধকারের সেই শৈল্পিক বিন্যাসে ফুটে উঠেছে মানুষের ভেতরের ছয় শত্রু কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য।
এই আয়োজনের নাম রিপু রজনী। সপ্তমী থেকে নবমী টানা তিন দিন দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় সামলাতে হিমশিম খেয়েছেন আয়োজকরা।
সেবাখোলা ও বৈকুণ্ঠধাম পূজা উদ্যাপন পরিষদের প্রধান ও প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক জুয়েল শীল কালবেলাকে বলেন, এই তিন দিনে প্রায় তিন লাখ মানুষ মণ্ডপটি দেখতে এসেছেন। তার হিসাবে, দশমীর দিনও দুপুর ৩টার পর থেকে দর্শনার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিকেলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এসেছেন। গতকাল রাত আড়াইটার দিকে এসেছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও মডেল পূজা চেরী রায়ও।
দেবীদর্শনের এ আয়োজন শুধু প্রতিমা ও আলোকসজ্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের অন্তর্জগতের অন্ধকারকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরার ভাবনাই একে দিয়েছে মণ্ডপটির আলাদা পরিচিতি। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তৈরি এই মণ্ডপের কাজ শুরু হয়েছিল পূজার দুই মাস আগে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও দর্শনার্থীরা এসেছেন।
মাটির বদলে ধাতব প্রতিমা, আয়নায় অন্তর্জগত
নগরীর উত্তর কাট্টলীর তালুকদারবাড়ির বাণী মন্দিরে এবার ৫৮তম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছে সেবাখোলা ও বৈকুণ্ঠধাম পূজা উদ্যাপন পরিষদ। মণ্ডপের প্রায় চার হাজার বর্গফুটের আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রিপু রজনী থিম।
কথা বলে জানা গেছে, রিপু অর্থ শত্রু। সনাতন ধর্ম ও দর্শনে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যকে মানুষের ছয়টি অভ্যন্তরীণ শত্রু বা ষড়রিপু বলা হয়। আর রজনী অর্থ রাত। এই দুই শব্দের সমন্বয়ে মানুষের অন্তরের অন্ধকার, প্রবৃত্তির সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং তা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন আয়োজকেরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মণ্ডপের মূল আকর্ষণ প্রতিমা নির্মাণে ধাতুর ব্যবহার। প্রচলিত মাটির প্রতিমার বদলে ধাতব উপাদানের ব্যবহারে দেবী দুর্গার অবয়ব পেয়েছে ভাস্কর্যধর্মী রূপ। তবে কাঠামোর ভেতরে খড়, বাঁশ ও মাটিরও ব্যবহার রয়েছে। মণ্ডপজুড়ে আয়নার ব্যবহার, নীল লেজার আলো ও কৃত্রিম কুয়াশা তৈরি করেছে আলো-আঁধারির ভিন্ন এক আবহ।
আরও দেখা যায়, দেবী দুর্গার পায়ের নিচে রাখা হয়েছে সম্পদের প্রতীকী উপস্থাপন। দেবীর পা সেই সম্পদকে স্পর্শ করছে না। পুরো বিন্যাসে দেবীকে জাগতিক সম্পদ ও মোহের ঊর্ধ্বে অবস্থানকারী শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা রয়েছে। আলো ও প্রতিফলনের সমন্বয়ে দর্শনার্থীদের সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং সেই অন্ধকার থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, থিমের পরিকল্পনা ও সৃজনশীল ভাবনায় ছিলেন অপটিমিস্টিক দে। প্রতিমা নির্মাণ ও কারুকাজে যুক্ত ছিলেন শিল্পী কার্তিক পাল এবং নিলয় নন্দী। আলোকসজ্জার দায়িত্বে ছিল কৈলাশ লাইটিং। তাদের সম্মিলিত কাজেই মণ্ডপটি হয়ে উঠেছে ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি শিল্পভাবনার একটি পরিসর।
‘মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে তুলে ধরেছি’
থিমের পরিকল্পনাকারী অপটিমিস্টিক দে বলেন, মানুষের মধ্যে কামনা, লোভ ও ক্রোধের মতো প্রবৃত্তি রয়েছে। এসব প্রবৃত্তি একেবারে দূর করা কঠিন হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। মানুষের জীবনে এসব রিপু যে অন্ধকার ডেকে আনে, তা কাটিয়ে ওঠার ভাবনাই শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
সেবাখোলা ও বৈকুণ্ঠধাম পূজা উদ্যাপন পরিষদের প্রধান জুয়েল শীল বলেন, ৫৮ বছরে পা রেখেছে আমাদের পূজা আয়োজন। এবার থিমের মাধ্যমে মানুষের ভেতরের লোভ, মোহ, হিংসা, ক্রোধ, অহংকার ও কামনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মণ্ডপটির ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
জুয়েল শীল বলেন, কলকাতার পূজামণ্ডপের সঙ্গে তুলনা করেও অনেকে আমাদের আয়োজনের প্রশংসা করেছেন।
ফেসবুক-ইউটিউব থেকে সরাসরি মণ্ডপে
রিপু রজনীর জনপ্রিয়তার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা। ফেসবুক ও ইউটিউবে বারবার থিমের ভিডিও চোখে পড়ায় সরাসরি মণ্ডপটি দেখার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁদের অনেকের।
দর্শনার্থী পূজা নাগ কালবেলাকে বলেন, প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মণ্ডপে ঢুকতে হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষায় কষ্ট হলেও ব্যতিক্রমী আয়োজনটি দেখতে পেরে আমার ভালো লেগেছে।
অনিক বড়ুয়া নামে আরেক দর্শনার্থী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিপু রজনীর ভিডিও বারবার চোখে পড়ছিল। সেখান থেকেই মণ্ডপটি সরাসরি দেখার আগ্রহ তৈরি হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি প্রবেশ করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণ করেছি, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষেরও উপস্থিতি ছিল।
বদলাচ্ছে পূজার আকর্ষণের মানচিত্র?
চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার কথা উঠলে দীর্ঘদিন ধরে জেএম সেন হল, হাজারী লেন ও কুসুমকুমারী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মণ্ডপগুলোর নাম দর্শনার্থীদের আলোচনায় এসেছে। তবে এবার উত্তর কাট্টলীর একাধিক থিমভিত্তিক আয়োজনও বিশেষ মনোযোগ কেড়েছে। সেখানে রিপু রজনীর পাশাপাশি অঘোর ও জল দুয়ার থিমে মণ্ডপ সাজানো হয়েছে। দর্শনার্থীদের ভিড় ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিচারে রিপু রজনী বিশেষভাবে সামনে এসেছে। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দুপুর থেকে গভীর রাত দীর্ঘ লাইন ছিল মণ্ডপে। মূল সড়ক পর্যন্ত দর্শনার্থীদের সারি বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের সড়কে যানজটও তৈরি হয়।
আয়োজকদের দাবি, ভিড় সামলাতে প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত ছিলেন। তারপরও দর্শনার্থীদের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। রাত চারটা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের থিম দেখানোর ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে।
শমীতেও দর্শনার্থীদের আনাগোনা, রাত সাড়ে ১০টাই বিসর্জন
দশমীর দিন সকাল থেকে দর্শনার্থীদের চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও দুপুরের পর ভিড় বাড়তে শুরু করে বলে জানান জুয়েল শীল। তিনি বলেন, বিকেল তিনটার পর থেকে প্রায় ২০ হাজার দর্শনার্থী মণ্ডপটি দেখতে এসেছেন। রাত ১০টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য মণ্ডপ খোলা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিসর্জন দেওয়ার কথা রয়েছে।
জুয়েল শীল বলেন, এবার দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও মানুষ এসেছেন। গত পরশু ভারত থেকে পাঁচজন দর্শনার্থী এসেছিলেন বলেও জানান তিনি। আগামী বছরও নতুন ভাবনায় থিম সাজিয়ে দর্শনার্থীদের এই ভালোবাসা ধরে রাখতে চান তাঁরা।
দেবীদর্শন, নাকি নিজের মুখোমুখি হওয়া?
রিপু রজনীর আকর্ষণ শুধু ধাতব প্রতিমা, আয়না কিংবা নীল আলোর খেলায় নয়। এর ভেতরে রয়েছে একটি প্রশ্ন। মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু কি সব সময় তার বাইরে, নাকি নিজের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে সেই শত্রু? কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। এসব প্রবৃত্তিকে চিনতে পারা এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করাই আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি উপায়। সেই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই সাজানো হয়েছে উত্তর কাট্টলীর এই মণ্ডপ। নগরীর ইপিজেড থানা এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থী পিও নাগ বলেন, দেবীদর্শন শেষে আমার উপলব্ধি হয়েছে, পূজা শুধু মণ্ডপে গিয়ে প্রতিমা দেখার নাম নয় নিজের ভেতরটাকেও একবার দেখে নেওয়ার উপলক্ষ। কারণ, অন্ধকার যত গভীরই হোক, তাকে জয় করার প্রথম শর্ত হলো তার অস্তিত্ব স্বীকার করা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. কুশল বরণ চক্রবর্তী কালবেলাকে বলেন, বিজয়া দশমীর মূল ভাবধারা হলো অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভর জয় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা। দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধের মধ্য দিয়ে অন্যায় ও অধর্মের পরাজয় এবং ন্যায় ও ধর্মের প্রতিষ্ঠার বার্তা প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে এটি নারীশক্তির জাগরণ ও মহিমারও প্রতীক।
তিনি বলেন, দশমী একদিকে যেমন দেবীকে বিদায় জানানোর বেদনার দিন, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, ক্ষমা, সম্প্রীতি ও পুনর্মিলনের বার্তা বহন করে। প্রণাম, আশীর্বাদ, কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে মানুষ পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুন করে দৃঢ় করে। উৎসবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, নিজের ভেতরের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ ও অহংকারের মতো নেতিবাচক প্রবৃত্তিকে সংযত করে আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া।
তার মতে, উত্তর কাট্টলীর রিপু রজনী থিমের সঙ্গে বিজয়া দশমীর এই দর্শনেরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। মানুষের ভেতরের ষড়রিপুকে শিল্পের ভাষায় তুলে ধরা যেমন আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগ তৈরি করে, তেমনি দশমীর বাণীও মনে করিয়ে দেয়, অশুভের বিরুদ্ধে প্রকৃত বিজয় কেবল বাইরের শক্তিকে পরাজিত করায় নয়, নিজের ভেতরের অন্ধকারকে জয় করার মধ্যেও নিহিত।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗