প্রতিদিনের চেনা চার দেয়াল, রাজপথের অবিরাম যানজট আর কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে মন প্রায়শই ব্যাকুল হয়ে ওঠে সবুজের ছোঁয়া পেতে। কিন্তু কর্মব্যস্ততার কারণে দীর্ঘ ছুটির অভাবের কারণে অনেকেরই থেকে যায়। এই স্বল্প সময়ে ঢাকার খুব কাছেই যদি পাওয়া যায় কোনো প্রাকৃতিক স্বর্গরাজ্য, তবে কেমন হয়?
নাগরিক ক্লান্তি দূর করে প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটাতে ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে নরসিংদী জেলার মাধবদীতে অবস্থিত হেরিটেজ ইকো রিসোর্ট। সবুজে মোড়ানো শান্ত এক পরিবেশ, বিশাল লেক আর আধুনিক সব নাগরিক সুযোগ-সুবিধার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে এই রিসোর্টে। আজ আমরা জানবো ঢাকার এত কাছে গড়ে ওঠা এই চমৎকার হেরিটেজ রিসোর্টের আদ্যোপান্ত।
হেরিটেজ রিসোর্টের অবস্থান ও চারপাশের পরিবেশ
নরসিংদী জেলার মাধবদী উপজেলার নওপাড়ার বাগান বাড়ি এলাকায় প্রায় ৭০ বিঘা বা বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই রাজকীয় রিসোর্ট। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪৬ কিলোমিটার। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের খুব কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও রিসোর্টের ভেতরে পা রাখলেই এক অপার্থিব নীরবতা ও শান্তি আপনাকে গ্রাস করবে।চারদিকে সারি সারি গাছপালা, সুনিপুণভাবে কাটা সবুজ ঘাসের গালিচা আর মাঝে সুবিশাল এক লেক—সব মিলিয়ে এটি যেন এক সবুজের স্বর্গরাজ্য। লেকের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শীতল হাওয়া আর পাখির কিচিরমিচির শব্দে নিমেষেই দূর হয়ে যায় মনের সব অবসাদ।
হেরিটেজ রিসোর্টে দেখার ও উপভোগ করার কী কী আছে?
হেরিটেজ রিসোর্টটি কেবল থাকার জায়গা নয়, বরং এটি বিনোদনের এক বিশাল ভাণ্ডার। পরিবার, বন্ধুবান্ধব কিংবা করপোরেট ট্যুরের জন্য এখানে বিনোদনের অসংখ্য চমৎকার উপাদান রাখা হয়েছে।
কৃত্রিম ওয়েভ পুল
হেরিটেজ রিসোর্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর কৃত্রিম ওয়েভ পুল বা কৃত্রিম সমুদ্র সৈকত। সাগরের মতো গর্জন করে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মাঝে সাঁতার কাটার এক অন্যরকম অনুভূতি পাবেন এখানে।
বিশাল সুইমিং পুল
বড় ও ছোটদের জন্য আলাদা সুরক্ষাসহ এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের সুপরিসর সুইমিং পুল। পুলের নীল জল আর চারপাশের নারকেল গাছের সারি যেন কোনো থাইল্যান্ড বা বালির বিলাসবহুল রিসোর্টের কথা মনে করিয়ে দেয়।
লেকে বোট রাইডিং ও ফিশিং
রিসোর্টের বিশাল লেকজুড়ে রয়েছে প্যাডেল বোট ও স্পিড বোট রাইডিংয়ের সুব্যবস্থা। শান্ত জলের বুকে নৌকাভ্রমণ আপনার বিকেলটাকে করে তুলবে মুখরিত। এছাড়া যারা মাছ ধরতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য রয়েছে ফিশিংয়ের বিশেষ ব্যবস্থা।
ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গেম জোন
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নিজেকে রাঙাতে এখানে রয়েছে অত্যাধুনিক ভিআর গেম জোন ও নাইন-ডি (নাইনডি) সিনেমা থিয়েটার। তরুণ ও গেমারদের জন্য এটি অন্যতম সেরা আকর্ষণ।
কিডস ওয়াটার পার্ক ও জোন
শিশুদের নিরাপদে খেলাধুলার জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় কিডস জোন এবং ছোট আকৃতির ওয়াটার পার্ক। রাইড ও পানিতে মেতে ওঠার সব আয়োজন এখানে বিদ্যমান।
সাসপেনশন ব্রিজ ও ওয়াটার কটেজ
লেকের ওপর নির্মিত আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতু বা সাসপেনশন ব্রিজ রিসোর্টের সৌন্দর্য বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা ছবি তোলার অভিজ্ঞতা চমৎকার।
মুন সিন কর্নার
আপনি যদি প্রিয়জনকে নিয়ে পূর্ণিমা রাতের জোছনা বিলাস করতে চান, তবে রিসোর্টের এই বিশেষ কর্নারটি আপনার জন্যই তৈরি। খোলা আকাশের নিচে বসে জোছনার আলোয় লেকের পানির ঝিকিমিকি রূপ দেখার অনুভূতি সত্যিই অতুলনীয়।
থাকার সুব্যবস্থা ও রুম ক্যাটাগরি
হেরিটেজ রিসোর্টে রাত্রিযাপনের জন্য রয়েছে অত্যন্ত চমৎকার ও আধুনিক কটেজ এবং ভিলা। প্রতিটি রুম আধুনিক আসবাবপত্র, সেন্ট্রাল এসি, হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই ও এলসিডি টিভি সমৃদ্ধ। রিসোর্টের কটেজগুলোকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
তালতলা কটেজ
সম্পূর্ণ গ্রামীণ আবহে তালগাছের সান্নিধ্যে তৈরি এই কটেজগুলো প্রকৃতিপ্রেমীদের মন কাড়বে।
বিলাসবহুল ভিলা
আধুনিক জীবনযাত্রার সব ধরনের প্রিমিয়াম সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে এই ভিলাগুলোতে।
ওয়াটার কটেজ
লেকের পানির ওপর নির্মিত এই কটেজগুলো হেরিটেজ রিসোর্টের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। কটেজের বারান্দায় বসে সরাসরি লেকের পানি আর মাছের খেলা দেখা যায়।
লেক ভিলা ও মনসুন ভিলা
লেকের ঠিক পাড় ঘেঁষে এবং বর্ষার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য বিশেষায়িত এই ঘরগুলো বেশ রাজকীয় ও আরামদায়ক।
খাবারের বৈচিত্র্যময় আয়োজন
রিসোর্টের ভেতরেই রয়েছে একটি চমৎকার ‘মাল্টি-কুইজিন রেস্টুরেন্ট’। এখানে অভিজ্ঞ শেফদের তত্ত্বাবধানে বাংলা, ইন্ডিয়ান, চাইনিজ ও কন্টিনেন্টাল খাবার পরিবেশন করা হয়। এছাড়া সন্ধ্যার আড্ডাকে জমিয়ে তুলতে রয়েছে লাইভ বার্বিকিউ স্টেশন, জুস বার এবং পেস্ট্রি শপ। রাত্রিযাপনের প্যাকেজের সাথে সাধারণত বুফে সকালের নাস্তা পরিপূরক হিসেবে থাকে।
ডে-লং ও নাইট স্টে প্যাকেজ
সময়ের ওপর ভিত্তি করে হেরিটেজ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অফার ও প্যাকেজ প্রদান করে থাকে।
ডে-লং প্যাকেজ
যারা কেবল দিনের বেলা ঘুরে আসতে চান, তাদের জন্য ডে-লং প্যাকেজ রয়েছে। সপ্তাহের কার্যদিবসে (রবি থেকে বুধবার) জনপ্রতি খরচ সাধারণত ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার কাছাকাছি এবং ছুটির দিনগুলোতে (বৃহস্পতি থেকে শনিবার) ২,৩০০ থেকে ২,৭০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই প্যাকেজে রিসোর্টে প্রবেশ, বুফে দুপুরের খাবার, সুইমিং পুল ও ওয়েভ পুল ব্যবহারের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
নাইট স্টে প্যাকেজ
আপনি যদি এক রাত থাকতে চান, তবে রুমের ক্যাটাগরি এবং সপ্তাহের দিনের ওপর ভিত্তি করে কটেজের ভাড়া ভিন্ন হয়। সাধারণ দিনগুলোতে ৭,০০০-১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ছুটির দিনগুলোতে কটেজ ও ভিলার ভাড়া ১১,০০০ থেকে ১৮,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ভাড়ার সাথে সাধারণত ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১০ শতাংশ সার্ভিস চার্জ অতিরিক্ত যোগ হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বিভিন্ন উৎসব, ঈদ কিংবা পূজায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ ছাড় বা প্যাকেজ ঘোষণা করে। তাই ভ্রমণের আগে তাদের অফিসিয়াল পেজ বা হটলাইনে যোগাযোগ করে সঠিক বুকিং মূল্য জেনে নেওয়া ভালো।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার অত্যন্ত কাছে হওয়ায় হেরিটেজ রিসোর্টে যাতায়াত করা খুবই সহজ এবং স্বস্তিদায়ক। আপনি সড়কপথে খুব সহজেই এখানে পৌঁছে যেতে পারেন।
বাসে যেতে চাইলে
ঢাকার গুলিস্তান, মহাখালী কিংবা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে নরসিংদী, ভৈরব বা সিলেটগামী যে কোনো বাসে (যেমন- মেঘালয় পরিবহন, বাদশাহ পরিবহন বা এনা ট্রান্সপোর্ট) উঠে পড়ুন। চালক বা হেলপারকে বলবেন আপনাকে মাধবদীর নওপাড়া বা ড্রিম হলিডে পার্কের একটু আগে নামিয়ে দিতে। ঢাকা থেকে রওনা দিলে প্রায় ১ থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই আপনি রিসোর্টের প্রবেশদ্বারে পৌঁছে যাবেন। বাস থেকে নেমে রিকশা বা ইজিবাইক নিয়ে সরাসরি চলে যাওয়া যায় মূল রিসোর্টে।
নিজস্ব গাড়ি বা সিএনজি
আপনি যদি নিজস্ব গাড়ি, মাইক্রোবাস কিংবা রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের মাধ্যমে যেতে চান, তবে ৩০০ ফিট পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে কাঞ্চন ব্রিজ পার হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে সোজা মাধবদী চলে আসতে পারেন। ঢাকার কেন্দ্রস্থল থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৪০ থেকে ৪৬ কিলোমিটার হওয়ায় ড্রাইভ করাও বেশ আরামদায়ক।
ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ
হেরিটেজ রিসোর্টে অননুমোদিত বা অগ্রিম বুকিং ছাড়া বাইরের দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকার সীমিত রাখা হয়। তাই যাওয়ার আগে অবশ্যই বুকিং নিশ্চিত করুন।
পুলে নামার জন্য উপযুক্ত সাঁতারের পোশাক সাথে নিয়ে যাওয়া ভালো।
রিসোর্টের ভেতরে বাইরের খাবার নিয়ে প্রবেশ করা নিষেধ।
আপনার বুকিং সংক্রান্ত তথ্যের জন্য বা সরাসরি যোগাযোগের জন্য তাদের অফিশিয়াল হটলাইন নম্বরে কল করতে পারেন।
অবারিত সবুজ, পানির কলতান আর পাখির কুহুতান—সব মিলিয়ে নরসিংদীর হেরিটেজ রিসোর্ট যেন এক টুকরো প্রশান্তির নীড়। ইট-পাথরের খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে পরিবারের প্রিয়জনদের মুখে একটুখানি হাসির ঝিলিক ফোটানো কিংবা বন্ধুদের সাথে স্মরণীয় একটি দিন কাটানোর জন্য এই রিসোর্টের জুড়ি মেলা ভার। তাই আর দেরি না করে আগামী সপ্তাহান্তেই প্ল্যান করে ফেলুন সবুজের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার এবং ঘুরে আসুন দৃষ্টিনন্দন হেরিটেজ রিসোর্ট থেকে।এমআইএইচ
