Published on
:
2 min read
প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
এই পুজোয় অঞ্জলি দিয়েছিলেন মোগল সম্রাট আকবরের হিন্দু মহিষী যোধাবাই। পুরুলিয়া শহরের নীলকণ্ঠ চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পুজোয় এখনও ফিরে ফিরে আসেন তিনি।
যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের সেনাধ্যক্ষ শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের বংশের উত্তরপুরুষদের হাত ধরে আজও পুরুলিয়ায় হয়ে আসছে সেই পুজো। ষোড়শ শতকের কথা। দিল্লির সম্রাট তখন জাহাঙ্গীর। আকবরের মহিষী যোধাবাইকে স্বপ্নে দেখা দিলেন দেবী দুর্গা। রাজপুত কন্যা যোধাবাই সেই স্বপ্ন পেয়ে দেন দেবীকে অঞ্জলি।
মোগল সম্রাট আকবর সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য সমগ্র বাংলাকে নিজের দখলে আনতে চেয়েছিলেন। সেই সময়ে বাংলার শাসনভার ছিল ১২ জন জমিদারের হাতে, ইতিহাসে যাঁরা ‘বারো ভুঁইয়া’ নামে পরিচিত। ১১ জন আকবরের আনুগত্য স্বীকার করলেও যশোররাজ প্রতাপাদিত্য ছিলেন অন্য ধাতুর। মোগলদের বিরুদ্ধে তিনি পাল্টা যুদ্ধ করে উত্তর ২৪-পরগনা থেকে শুরু করে বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, যশোর, নড়াইল নিজের অধিকার বিস্তৃত করেছিলেন। ব্রিটিশদের হাত থেকে সপ্তগ্রাম বন্দর লুট করে নিয়েছিলেন প্রতাপাদিত্য। পর পর দু’বার মোগল বাহিনীকে হারিয়েছিলেন।
প্রতাপাদিত্যকে বাগে আনতে অম্বররাজ মান সিংহকে বাংলার সুবেদার করে পাঠিয়েছিলেন আকবর। মান সিংহ বুঝেছিলেন জলে-জঙ্গলে ভরা বাংলাদেশের দক্ষ সেনাদের কোনওদিন বাগে আনতে পারবেন না। তাই নেন ছলনার আশ্রয়। ধূমঘাটের কাছে ছিল প্রতাপাদিত্যের বিশাল প্রাসাদ। যে প্রাসাদ ছিল কার্যত গোলকধাঁধা। প্রতাপাদিত্যের সামরিক বাহিননীর প্রধান ছিলেন শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী, যশোরেশ্বরী মা ভবানী ও মা কালীর উপাসক। মান সিংহ বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে ঢাকায় ঘাঁটি গেড়ে গুপ্তচর নিয়োগ করে প্রাসাদ দখন করতে শঙ্করকে বশে আনার চেষ্টা করেন। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
পরে প্রতাপাদিত্যের শত্রু সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতার সাবর্ণ জমিদার ও বাঁশবেড়িয়ার জমিদারদের সাহায্য নিয়ে অতর্কিতে ধূমঘাট আক্রমণ করেন মান সিংহ। পরাস্ত হয় প্রতাপাদিত্য-শঙ্কর চট্টোপাধ্যায় জুটি। দু’জনকে বন্দি করে দিল্লির সম্রাটের কাছে পাঠানো হয়। মান সিংহ যশোরেশ্বরীর বিগ্রহ অপহরণ করে অম্বরে নিয়ে যান। আজও সেখানে যশোরেশ্বরীর পুজো হয়। বন্দিদশায় বারাণসী সেনা ছাউনিতে প্রতাপাদিত্যের মৃত্যু হয়। শঙ্করকে দিল্লিতে আনা হয়। সম্রাটের আদেশে আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়। কারাগারে শঙ্করের সময় কাটত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে। একদিন আসে মহালয়া। পিতৃপুরুষকে জলদানের জন্য আবেদন করেন শঙ্কর, কিন্তু সম্রাট তা নাকচ করেন। শঙ্কর বন্দি অবস্থায় শুরু করেন অনশন।
সেই খবর পেয়ে যোধাবাই পুত্র জাহাঙ্গীরকে জানান, শঙ্করের সেই ইচ্ছাপূরণ করতে। শঙ্কর যমুনার ঘাটে তর্পণের অনুমতি পান। যমুনার ঘাটে তর্পণ দেখতে আসা মানুষের মধ্যে ছদ্মবেশে ছিলেন যোধাবাই। তর্পণ দেখে তিনিও মোহিত হয়ে পড়েন। এক দিন নিজে কারাগারে গিয়ে শঙ্করকে জানান, তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। শঙ্কর জানান, তিনি মহাদেবের ভক্ত। মুক্তি পেলে গ্রামে ফিরে তাঁর পুজো করবেন। যোধাবাই তাঁকে অনুরোধ করেন দুর্গার পুজো করার জন্য। তাঁর প্রসাতেবে সম্মতি দিতে পারেননি শঙ্কর। তখন যোধাবাই জানান, তাঁর নামে হবে দুর্গাপুজো। তিনি যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবেন। পুজোর সময়ে তিনি সশরীরে সেখানে গিয়ে অঞ্জলি দেবেন। বারাসতের ভিটেয় দেবী দুর্গার পুজোর আয়োজন করেন শঙ্কর। সংকল্প হলো যোধাবাইয়ের নামে।
পুরুলিয়ার ইতিহাস গবেষক ভাস্কর বাগচী বলছেন, ‘রীতি মেনে সেই পুজো আজও হয় পুরুলিয়ায়। এটাই শহরে নীলকন্ঠ চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের পুজো নামে পরিচিত। এই পরিবারে এসেছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। শঙ্করের উত্তরপুরুষ রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের বংশধররা পরবর্তীকালে দক্ষিণেশ্বর, বর্ধমান–সহ নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েন। আমরা যেমন বর্ধমান থেকে এসেছি পুরুলিয়ায়। তবে এখন আর পুজোর সংকল্প যোধাবাইয়ের নামে হয় না।’
