নেত্রকোনার দুর্গাপুরে শয়নকক্ষে ব্যবসায়ী অরুণ কুমার সাহা (৭৪) ও তাঁর স্ত্রী হেনা রানী সাহাকে (৬৫) গলা কেটে হত্যার প্রায় ১১ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো এ জোড়া খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। দীর্ঘ সময়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন অন্তত নয়বার। সর্বশেষ পিবিআই তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় অজানাই রয়ে গেছে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর দুর্গাপূজার শেষ দিন ভোর থেকে বেলা ১টার মধ্যে দুর্গাপুর পৌরশহরের মধ্যবাজার এলাকায় নিজেদের তিনতলা ভবন সুবর্ণা প্লাজার তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে খুন হন অরুণ-হেনা দম্পতি। অরুণ কুমার সাহা ওই ভবন ও সুবর্ণা বস্ত্রালয়ের মালিক ছিলেন।
দম্পতির ছোট ছেলে সুদীপ কুমার সাহা ও মেয়ে সুলেখা সাহা ইতালিতে এবং বড় মেয়ে সুবর্ণা সাহা কানাডায় থাকেন। বড় ছেলে সুজিত কুমার সাহা মা-বাবার সঙ্গে থাকতেন। ঘটনার আগের দিন তিনি ঢাকায় যান। পরদিন সকালে মা-বাবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পাশের বাসার কাকা অজিত কুমারকে বিষয়টি জানান। পরে অজিতের স্ত্রী সুচিত্রা বাসার দরজা খোলা দেখে ভেতরে ঢুকে পৃথক দুটি কক্ষের মেঝেতে অরুণ ও হেনার গলাকাটা ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।
ঘটনার তিন দিন পর সুজিত কুমার সাহা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তবে তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার শুরুতে হত্যাস্থল সংরক্ষণ ও আলামত সংগ্রহ করা হয়নি, যা পরবর্তী তদন্তে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৫ সালের ২৬ নভেম্বর মামলাটির তদন্তভার দুর্গাপুর থানা-পুলিশের কাছ থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়। সিআইডিতে তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর ২০১৭ সালের শেষ দিকে তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার শঙ্কর কুমার দাস আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তিনি তখন জানিয়েছিলেন, দেরিতে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ায় অনেক আলামত নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সন্দেহভাজন কয়েকজনের মুঠোফোনের কল রেকর্ডও পাওয়া যায়নি।
এরপর বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করলে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলাটি পুনঃতদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। সংস্থাটিতে পাঁচবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক অভি রঞ্জন দেব ২০২৪ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে দুর্গাপুর চৌকি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তাঁর ভাষ্য, অপরাধস্থলসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষিত না থাকায় তদন্তে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে।
দীর্ঘদিনেও হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী সুজিত কুমার সাহা। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আমার মা-বাবার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন হোক।’ তাঁর অভিযোগ, ‘রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পেরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। কিন্তু হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি।’
এ বিষয়ে নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রেজওয়ান আহমেদ বলেন, দুর্গাপুরে সাংবাদিক আলিফ হত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ড গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার আশা প্রকাশ করেন তিনি।
