৩৩ মিনিট আগে
![]()
শাহীন মোল্লা
![]()
তৌসিফ কাইয়ুম
অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহির | ছবি: সংগৃহীত
পূর্বাচলে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাড়িতে প্রায় এক বছর ধরে মাদক সেবন, অবৈধ ডিজে পার্টি ও নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলে আসলেও অপরাধীরা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ, ওই বাড়ি থেকে মাত্র ৩০ গজ দূরেই রয়েছে ছয়তলাবিশিষ্ট একটি পুলিশ ফাঁড়ি।
বাড়িটি একটু নির্জন অংশে হলেও সেখানে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো মোটেও গোপন ছিল না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায়ই বাড়ির সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে রাস্তায় গাড়ির সারি থাকত এবং গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চশব্দে চলতো গান-বাজনা। পুলিশ ফাঁড়ি থেকেও তা স্পষ্ট শোনা যেত।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল গত সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের ওই বাড়িতে অভিযান চালায়। এরপর সেখানে মাদক সেবন ও অবৈধ ডিজে পার্টি আয়োজনের খবর সামনে আসে।
একজন পুলিশ সদস্যের বাড়িতে দীর্ঘ দিন ধরে এমন কর্মকাণ্ড চললেও কেন পুলিশ আগে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তারা জানতেন যে বাড়িটি পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এবং সেখানে নিয়মিত সামাজিক অনুষ্ঠান হতো।
তবে সেখানে ডিজে পার্টি বা মাদক সেবনের মতো অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলতো, সে সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না। তিনি আরও বলেন, ‘যখনই আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি, ডিবি সেখানে অভিযান চালিয়েছে।’
ডিবি জানায়, ২০২৫ সাল থেকে বাড়িটিতে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টির আয়োজন করা হতো, যেখানে অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের ডাকা হতো।
গতকাল পূর্বাচলের পুলিশ হাউসিং-১ এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, তত্ত্বাবধায়ক ও নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড়িটিতে নিয়মিত জনসমাগম হতো। উচ্চশব্দে চলতো গান-বাজনা।
ওই বাড়ি থেকে ১০০ গজ দূরে পাঁচ বছর ধরে ছোট একটি বাড়িতে পরিবারসহ বসবাস করছেন আব্দুল জহির। তিনি বলেন, প্রায় এক বছর ধরেই এসব অনুষ্ঠান চলে আসছিল।
তিনি আরও বলেন, প্রায়ই বাড়ির বাইরে ছয়-সাতটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত এবং শক্তিশালী সাউন্ড সিস্টেমে বাজানো হতো গান।
সেখানে আসা বিভিন্ন বয়সী তরুণ-তরুণী, এমনকি বয়স্কদেরও বাড়ির সামনের খোলা জায়গায় নাচতে দেখা যেত, বলেন স্থানীয়রা।
শুরুর দিকে মাসে তিন থেকে চারবার এসব আয়োজন হলেও সম্প্রতি তা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে প্রতি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার আয়োজন করা হতো।
কিছু পার্টি সকালে শুরু হয়ে দুপুর বা বিকেল পর্যন্ত চলতো, আবার কোনো কোনোটি এশার নামাজের পরও চলতে থাকতো। তবে আজানের সময় গান-বাজনা বন্ধ রাখা হতো।
কাছাকাছি একটি মসজিদের ইমামও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফজরের নামাজের পর রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় তিনি প্রায়ই বাড়ির বাইরে নারী-পুরুষদের নাচতে দেখতেন।
পুলিশ হাউসিংয়ের প্রবেশদ্বারের এক নিরাপত্তাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয়ভাবে বাড়িটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়ার ভেন্যু হিসেবে পরিচিত ছিল।
ফাঁড়িতে গিয়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা দ্য ডেইলি স্টারের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির গতকাল ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, সেখানে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো।’
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সাল থেকে বাড়িটি এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল এবং মাহবুব আলম নামে এক ব্যক্তি এসব ডিজে পার্টির সহ-আয়োজক হিসেবে পুরো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন। পার্টি থেকে আসা আয়ের ৩০ শতাংশ মাহবুব নিতেন এবং বাকি ৭০ শতাংশ অতিরিক্ত ডিআইজি জহির পেতেন।
ছয় কক্ষবিশিষ্ট বাড়িটির পাঁচটি কক্ষ ভাড়া দেওয়া হতো। বাকি একটি কক্ষে তত্ত্বাবধায়ক থাকতেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলার মাধ্যমে বাড়িটির বুকিং নেওয়া হতো।
ডিবি কর্মকর্তা ইলিয়াস জানান, ১০ জনের জন্য পুরো বাড়ি ও পাঁচটি অতিথি কক্ষ প্রতিদিন ১৮ হাজার ৫০০ টাকায় ভাড়া দেওয়া হতো। এছাড়া, প্রতিটি পার্টিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ৬০০ টাকা করে নিবন্ধন ফি দিতেন।
সাদমান রিফাত ও পরম গুহ নিয়োগী নামে দুই তরুণ এসব পার্টি আয়োজনে মাহবুবকে সহায়তা করতেন।
পার্টিতে অংশ নেওয়া বেশিরভাগই বিত্তশালী পরিবারের সদস্য, যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও ব্যাংকাররাও ছিলেন।
অভিযানের বর্ণনা দিয়ে ইলিয়াস বলেন, ডিবি সদস্যরা বাড়িটিতে প্রায় ২২টি গাড়ি দেখতে পান। তখন সেখানে উচ্চশব্দে গান বাজছিল এবং পুরো এলাকা সিসার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল।
জব্দ তালিকা নিয়ে প্রশ্ন
ব্যাপক মাদক সেবন ও নিয়মিত ডিজে পার্টির অভিযোগ থাকলেও প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযান শেষে ডিবির জব্দ তালিকাটি যেন ভিন্ন এক চিত্রই তুলে ধরল।
তালিকা অনুযায়ী, এক বোতল ইন্ডিয়ান আইকনিক হোয়াইট হুইস্কি, এক লিটারের বোতল থেকে ৫০০ মিলি রয়েল স্ট্যাগ হুইস্কি, এক লিটারের বোতল থেকে ২০০ মিলি রাশিয়ান স্মিরনফ ভদকা এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কেরু’জ ইমপেরিয়াল হুইস্কির একটি খালি বোতল উদ্ধার করেছেন গোয়েন্দারা।
পাশাপাশি জব্দ করা হয়েছে মাত্র একটি ইয়াবা ট্যাবলেট, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং সামান্য পরিমাণ ‘কুশ’।
৮৫ জনকে আটক করার মতো একটি অভিযানে এত কম পরিমাণ মাদক উদ্ধার হওয়া নিয়ে খোদ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে ইলিয়াস কবির ডেইলি স্টারকে বলেন, গোয়েন্দা সদস্যরা পৌঁছানোর আগেই পার্টিতে অংশগ্রহণকারীরা মদ ও ইয়াবা সেবন করে ফেলেছিলেন। ফলে, যা অবশিষ্ট ছিল, কেবল সেটুকুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযান শুরুর পর অতিরিক্ত ডিআইজি জহির বারবার তদন্তকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মাহবুবকে গ্রেপ্তার না করার অনুরোধ জানান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘অভিযান চলাকালীন তিনি ইলিয়াস কবিরকে তিনবার ফোন করেছিলেন।’
জানতে চাইলে জহির এ তথ্য স্বীকার করে বলেন, তিনি মাহবুবের পক্ষ নিয়ে তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
‘আমার ধারণা ছিল, মাহবুব অতিথিদের বাড়ির নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছিলেন, যার মধ্যে মাদক সেবনে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও ছিল। আমি চাইনি, একজন গরিব মানুষ তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে অহেতুক বিপদে পড়ুক,’ যোগ করেন তিনি।
জহির আরও বলেন, ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পর তিনি আর কোনো অনুরোধ করেননি।
মাহবুব তাকে জানিয়েছিলেন, অনুষ্ঠানে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ জন অংশ নেবেন, কিন্তু পরে ডিবির ব্রিফিং থেকে তিনি জানতে পারেন সেখান থেকে ৮৫ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
‘এটি জানার পর আমি বুঝতে পারি, মাহবুব আমাকে ভুল তথ্য দিয়েছেন। এখন আমাকে খতিয়ে দেখতে হবে, তিনি অন্য কোনো বিষয়েও আমাকে বিভ্রান্ত করেছেন কি না,’ বলেন জহির।
তিনি আরও জানান, বাড়িটি তত্ত্বাবধায়নের ক্ষেত্রে মাহবুবের ভূমিকা তিনি যাচাই করবেন এবং সেখানে কোনো গাফিলতি বা অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেবেন।
এদিকে, ওই বাড়ি থেকে আটক ২৬ নারী ও ৫৯ পুরুষকে সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে।
পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অতিরিক্ত ১৫ দিনের জেল এবং নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত তিন দিন জেল খাটতে হবে।
ইলিয়াস জানান, তারা এখন নিয়মিত বুকিং, নিবন্ধন ফি নিয়ে পার্টি আয়োজনের এই পুরো প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছেন।
