গ্যাস অনুসন্ধানে তৃতীয় পক্ষের ফিজিবিলিটি স্টাডি থেকে অব্যাহতির বিষয়ে এখনও অনুমোদন পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মান্নান। এ কারণে ঝুলে রয়েছে ছাতকসহ বেশকিছু গ্যাসফিল্ডের জরুরি উন্নয়ন প্রকল্প।
দেওয়া আধা-সরকারিপত্রে (ডিও) যে কাজ হবে না, বিষয়টি অনেক আগেই জানা গিয়েছিল। পরিকল্পনা মন্ত্রীর বরাবরে ডিও দেওয়ার পর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকতা এমন মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কোনো সিগন্যাল না এলে তাদের পক্ষে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব নয়। সমাধান চাইলে প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তারপর কয়েকমাস গত হলেও বিষয়টি ঝুলেই রয়েছে।
দেশের গ্যাস খাত এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যখন দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের ধস ঠেকানো যাচ্ছে না, তখন সহসা আমদানি বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে গেলে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করতে হবে। তড়িৎ উদ্যোগ নিলেও কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে। আর স্থায়ী টার্মিনালে সময় লাগবে ৫ থেকে ৭ বছরের মতো।
এই যখন পরিস্থিতি তখন শুধু এফএসআরইউ কিংবা এলএনজি টার্মিনাল হলেই আমদানি ইচ্ছামতো বাড়ানোর সুযোগ নেই। মহেশখালী থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে। ওই প্রকল্পের জন্য ২৪ হাজার কোটি টাকার খরচ প্রাক্কলন করা হয়েছে। আবার দ্বীপজেলা ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাসও আনা যাচ্ছে না পাইপলাইন অভাবে। এসব কারণে ২০২৭-২৮ সালে দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নানা কারণে বিশাল মজুতের ছাতক গ্যাসক্ষেত্রটি খুবই আকর্ষণীয় বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য মজুত ২ থেকে ৫ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) বিবেচনা করা হয়। সেখানে গ্যাস পাওয়া গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব, যা আর কোন ফিল্ডে সম্ভব নয়। ২০২১ সালে জকিগঞ্জে গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কার হলেও এখন সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ রকম ভোলা, জামালপুরসহ অনেক উদাহরণ রয়েছে।অন্যদিকে ছাতকে পাইপলাইন বিদ্যমান, দ্রুত সময়ের মধ্যে লাইনে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব।
সেই ছাতকে কূপ খননের ডিপিপিও ঝুলে রয়েছে তৃতীয়পক্ষের কাছে। যে গতিতে চলছে তাতে ২০২৭-২৮ সালে ওই গ্যাস প্রাপ্তি নিয়ে সংশয় দেখছেন অনেকেই। এ রকম আরও অনেক গুরুত্বপূর্ন প্রকল্প ঝুলে রয়েছে। বর্তমান সরকারের ৮ মাসে মাত্র ১টি ডিপিপি অনুমোদিত হয়েছে। ১৯টি ডিপিপি আটকে রয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্তরে।ডিপিপিগুলো এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হলে উন্নয়ন প্রকল্প থামকে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
তৃতীয়পক্ষের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি একদিকে যেমন সময়সাপেক্ষ অন্যদিকে ব্যয়বহুল। নানা কারণে ক্ষমতায় বসেই ডিও দিয়েছিলেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি আধা-সরকারিপত্রে লিখেছেন, পরিকল্পনা বিভাগ থেকে জারিকৃত “সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকায় ৫০ কোটি টাকার উর্ধে প্রক্কলিত ব্যয়ের সকল বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে তৃতীয় পক্ষের দ্বারা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সাইসমিক সার্ভে ও কূপ খনন প্রকল্পসমুহ একই প্রকৃতির হওয়ায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রদত্ত বিসিআর, আইআইআর ও ইআইএ সকলক্ষেত্রে প্রায় একই রকম হয়। পরিপত্র শিথিল করা হলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকরণ দ্রুততার সঙ্গে সম্পাদন করা সম্ভব।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সাবেক সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও অনেক চেষ্টা করেছিলেন ফিজিবিলিটি স্টাডি থেকে অব্যাহতির জন্য।পরিকল্পনা বিভাগের সচিব বরাবরে চিঠিতে তিনি লেখেন, দ্রততম সময়ে ও অর্থসাশ্রয় করে বাপেক্সের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনপূর্বক অতিরিক্ত অর্থব্যয় ব্যতিরেকে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা সম্ভব। গুরুত্বপুর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্নের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ধাপ অনুসরণ করতে হয়। এ সকল কার্যক্রম অনুসরণ করে চূড়ান্ত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন পেতে ৬ থেকে ১২ মাস সময় প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পে সমীক্ষা বাবদ ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়।
পেট্রোবাংলার সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। আর সেই কোম্পানিতে (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি-আইআইএফসি) জড়িত রয়েছে হোমড়া-চোমড়া সাবেক আমলারা। যখনই বিষয়টি সামনে আসে তখনেই তারা পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন।
২০২২ সালে পরিপত্র জারির আগেও বাপেক্স নিজেরাই এই কাজ করতো। ওই অর্ডারের পর ডিপিএম (সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি) বুয়েট, আইবিএ, আইআইএফসির মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়। তবে এখন পর্যন্ত আইআইএফসি ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার নজীর খুঁজে পাওয়া যায়নি। যে কারণে তারা যে দর দাবি করে সেই দরে তাদের নির্ধারিত সময়ে চুক্তি করা হয়। এতে করে অনেক কাজ যথা সময়ে করা যায়না বলে বাপেক্স দাবি করেছে।
বাপেক্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, সিসমিক সার্ভে, মূল্যায়ন কূপ এবং অনুসন্ধান কূপ খননও এক ধরনের প্রাক সমীক্ষা। তার আবার সম্ভাব্যতা যাচাই কি। অতীতে অনেক কূপ ড্রাই হয়েছে ভবিষ্যতেও হতে পারে। তারা কি কখনও দায় নিয়েছে কূপ ড্রাই হওয়ার। আন্তর্জাতিকভাবে ১০টি কূপ খনন করে ১টিতে গ্যাস পেলে সফল বিবেচনা করা হয়।
যখন অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার জরুরি ছিল, সেই সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরও একটি পেরেক ঠুকে দিয়ে গেছে। জিডিএফ অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হতো। ওই প্রকল্প অনুমোদন দিতেন মন্ত্রী অথবা উপদেষ্টা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়। এনইসির অনুমোদনের পর শুধু জিও জারি হতেই সময় লেগে যায় ৩ থেকে ৪ মাসের মতো। আর পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনেও কয়েক মাসের ধাক্কা। যদি কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয় তাহলেতো কথাই নেই। এসব জটিলতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
