খন্দকার জলিল, জেলা প্রধান, পটুয়াখালী: সাগরকন্যা কুয়াকাটায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বহুল আলোচিত ‘কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল’ শেষ হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত প্রধান অতিথি হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই, পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নুরুন্নাহার চৌধুরীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তবে জাঁকজমকপূর্ণ ও বর্ণিল এই আয়োজনের নেপথ্যে থাকা অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং সমন্বয়হীনতার কারণে অনুষ্ঠানটি নিয়ে এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, পর্যটক এবং স্থানীয়দের করা নানা মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রচারণায় যেমন আকর্ষণীয় ও আন্তর্জাতিক মানের আয়োজনের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তেমন দেখতে পাননি দর্শনার্থীরা।অনুষ্ঠানটির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ছিল পুরোপুরি বিশৃঙ্খল ও অপরিকল্পিত—এমনটাই মনে করছেন অনেকে।পর্যটকদের প্রধান অভিযোগ ছিল তারকা ও শিল্পী নির্বাচন নিয়ে। কার্নিভালে দেশের নামি-দামী ও জনপ্রিয় অভিনেতা, তারকা খেলোয়াড় কিংবা শীর্ষস্থানীয় ও মানসম্মত সংগীত শিল্পীদের উপস্থিতি থাকার কথা থাকলেও তাদের অনুপস্থিতি দর্শকদের ভীষণভাবে হতাশ করেছে। যারা এসেছিলেন তাদের পরিবেশনা এবং সাউন্ড সিস্টেমের মান নিম্নমানের ছিল বলে দর্শকরা ন্যূনতম আনন্দটুকুও পাননি। শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই নয়, কার্নিভালের অন্যান্য আকর্ষণ ও ইভেন্টেও ছিল চরম শৃঙ্খলার অভাব। ম্যারাথন দৌড় বা প্রতিযোগিতাসমূহে অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রার্থীরা রেজিস্ট্রেশন করেও প্রয়োজনীয় কিট বা সহায়তা পাননি, এমনকি তথ্যকেন্দ্রেও কোনো দায়িত্বরত ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবাসন সংকট নিয়ে পর্যটকদের দুর্ভোগের সীমা ছিল না।নামমাত্র ডিসকাউন্ট বা ছাড়ের কথা প্রচার করা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে তার বিপরীত। কুয়াকাটার তিন শতাধিক হোটেল-মোটেলে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় সামাল দেওয়ার মতো সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় এবং আকাশচুম্বী ভাড়ার কারণে সাধারন পর্যটক বাজেটের মধ্যে রুম না পেয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে। খাবারের চড়া দাম ও প্রতারণার অভিযোগও ছিল বেশ তীব্র। হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে খাবারের বিল রাখা হয়েছে ইচ্ছেমতো। বিশেষ করে কার্নিভালে একটি ডাব ২৫০ টাকা পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি করতে দেখা গেছে। রেস্তোরাঁগুলোতে খাবারের মূল বিল অতিরিক্ত বাড়িয়ে ধরে তার ওপর ডিসকাউন্টের নামে আগের সেই বাড়তি টাকাই কৌশলে রেখে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে পর্যটকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রচার-প্রচারণায় কোটি টাকার বড় বড় বুলি আওড়ানো হলেও শেষ পর্যন্ত এই আয়োজন কুয়াকাটার পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। স্থানীয়দের মতে, এমন অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ আয়োজন কুয়াকাটার সুনামে বড় ধরনের স্থায়ী দাগ ফেলে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে দূরদূরান্তের পর্যটকদের কুয়াকাটামুখী হওয়ার আগ্রহ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেবে। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকরা কিছুটা শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, তবে সামগ্রিক অব্যবস্থাপনার ভিড়ে সেই প্রচেষ্টা পুরোপুরি ঢাকা পড়ে যায়। অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।
The post কুয়াকাটা পর্যটন কার্নিভাল সফল সমাপ্তির আড়ালে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ appeared first on Matrijagat.
