বলিউডে সাফল্যের জন্য তিন দশক ধরে বিরামহীন কাজ করেছেন আমির খান। নিখুঁত অভিনয়, ভালো সিনেমা আর নতুন কিছু করার নেশায় ডুবে ছিলেন সব সময়। কিন্তু কাজের পেছনে ছুটতে গিয়ে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময় যে হারিয়ে ফেলেছেন, তা উপলব্ধি করেছেন দেরিতে। বড় হয়ে গেছে তাঁর সন্তানেরা, বদলে গেছে সম্পর্কের সমীকরণ। সেই উপলব্ধির কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না ৬১ বছর বয়সী এই অভিনেতা।
বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের জীবন ও ক্যারিয়ার নিয়ে এক আলোচনায় অংশ নেন আমির। সেখানে করোনাকালের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। জানান, প্রায় ৩০ বছর কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে পরিবার ও কাছের মানুষদের সময় দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবেননি।
আমির বলেন, ‘করোনার সময় বসে ভাবছিলাম, জীবনের প্রায় ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে। এক বছর, দুই বছর কিংবা পাঁচ বছর নিজের কাজ নিয়ে পাগলের মতো মেতে থাকা যায়। কিন্তু সেটা যদি ৩০ বছর ধরে চলতে থাকে, তাহলে সম্পর্কগুলো হারিয়ে যায়। আপনার সন্তানেরা বড় হয়ে যায়, তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। তখন আমার ভেতরে গভীর এক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।’
কথাগুলো বলতে গিয়ে কয়েকবার থামতে হয় অভিনেতাকে। নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে দর্শকদের কাছে ক্ষমাও চান তিনি। তখন উপস্থিত দর্শকেরা করতালি দিয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান।
‘৫৬ বছর বয়সে বুঝেছি, ৮৬ বছরে বুঝলে দেরি হয়ে যেত’
আমিরের উপলব্ধি অবশ্য কেবল অতীতের আফসোসে আটকে নেই। গত চার বছরে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের জন্য সচেতনভাবে সময় বের করার চেষ্টা করছেন তিনি। কাজ যেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত দখল করে না নেয়, সে বিষয়েও সতর্ক হয়েছেন।
এ উপলব্ধি আরও আগে হলে ভালো হতো কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরও যেন নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন অভিনেতা। আমির বলেন, ‘আমি খুব খুশি যে এই ভাবনা আমার ৫৬ বছর বয়সে এসেছে, ৮৬ বছর বয়সে নয়। তখন হয়তো কিছু করার জন্য সত্যিই অনেক দেরি হয়ে যেত।’

প্রথম ছবির সাফল্যের পরই ব্যর্থতার ভয়
আলোচনায় নিজের ক্যারিয়ারের কঠিন সময়ের কথাও তুলে ধরেন আমির। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ তাঁকে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। ছবিটির সাফল্যের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ছয় মাসে নয়টি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি।
শুরুতে মনে হয়েছিল, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাবেন। কিন্তু একের পর এক ছবি বক্স অফিসে ব্যর্থ হতে থাকলে পরিস্থিতি বদলে যায়। একটি সফল ছবি দিয়েই পরিচিতি পাওয়া অভিনেতা হিসেবে থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তাঁকে গ্রাস করে।
সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে আমির জানান, তৎকালীন স্ত্রী রিনার কাছে ফিরে গিয়ে কাঁদতেন তিনি। একের পর এক ছবি দর্শকের মন জয় করতে না পারায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
আমিরের ভাষায়, ‘সেই সময় মানসিক ও আবেগের দিক থেকে মনে হতো, আমি যেন চোরাবালিতে আটকে গেছি। ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছি। বেরিয়ে আসার জন্য যত বেশি চেষ্টা করছি, ততই আরও গভীরে চলে যাচ্ছি।’
সিঙ্গাপুরে বিশেষ সম্মান, ‘লগান’-এর ২৫ বছর
সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এবার আমির খানকে দেওয়া হয়েছে স্ক্রিন আইকন পুরস্কার। হংকংয়ের চলচ্চিত্র নির্মাতা পিটার চ্যান হো-সান তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেন। পরে সিঙ্গাপুরের কৌতুকাভিনেতা ঋষি বুধরানির সঞ্চালনায় নিজের জীবন ও কাজ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন অভিনেতা।
এর আগে ২০১৭ সালে উৎসবে গিয়েছিলেন আমির। সে সময় সেখানে প্রদর্শিত হয়েছিল তাঁর প্রযোজিত ছবি ‘সিক্রেট সুপারস্টার’। এবার উৎসবে তাঁর প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশের ছবি ‘লগান’-এর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে অবলম্বন
