বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বসিক) প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন ও বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। দুই নেত্রীর অনুসারীদের সংবাদ সম্মেলন ও পাল্টা সংবাদ সম্মেলনে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিপরীত অবস্থান নেওয়ায় স্পষ্ট হচ্ছে নগর বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা জানান, বিএনপি সরকার গঠনের পর শিরিন ও নাসরিন বসিকের প্রশাসক পদপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে শিরিনকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই দুই নেত্রীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেতে থাকে।
অন্যদিকে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর নাসরিন স্থানীয় রাজনীতিতে কিছুটা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। বিভিন্ন সময়ে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিজের বলয় তৈরির চেষ্টা করেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রচারে অংশ নিলেও তিনি ও তার অনুসারীরা মজিবর রহমান সরোয়ারের পক্ষে প্রচার চালাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আরও পড়ুন
অন্যদিকে শিরিনকে ঘিরেও বরিশাল বিএনপিতে অসন্তোষ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও পুকুর অবৈধভাবে দখলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১১ আগস্ট বিএনপির কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে তার সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ স্থগিত করা হয়। ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর তার ওপর আরোপিত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। চলতি বছরের ১৪ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শিরিনকে বসিকের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৭ মার্চ তিনি নগর ভবনে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দলীয় একাংশের অভিযোগ, প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়ার পর শিরিন নিজের অনুসারীদের নিয়ে আলাদা বলয় তৈরি করেছেন। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের গুরুত্ব না দেওয়া, দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা এবং প্রশাসনিক নিয়োগে দলীয় বিবেচনাকে যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শিরিনের সঙ্গে মজিবর রহমান সরোয়ার, মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল ইসলাম, বর্তমান আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারসহ বিভিন্ন নেতার সম্পর্ক ও অবস্থান নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি জনসভায় স্থানীয় সংসদ সদস্যকে নিয়ে তার মন্তব্যও অসন্তোষ বাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন
এ ছাড়া গত রবিবার বরিশাল প্রেসক্লাবে দুই নেত্রীর পক্ষের পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এই বিরোধ নতুন করে সামনে আসে। বিকেল ৪টায় ওয়ার্ড বিএনপির নেতা শরীফ ফিরোজ আহমেদ বসিকের প্রশাসক শিরিন ও মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নাসরিনের বিরুদ্ধে মারধর, চাঁদা দাবি, জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ করেন।
এক ঘণ্টা পর একই স্থানে নাসরিনের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন একই ওয়ার্ডের বিএনপির নেতা মনোয়ার হোসেন। তিনি শিরিন ও জিয়াউদ্দিন সিকদারের বিরুদ্ধে পাল্টা চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন। এ সময় নাসরিন সাংবাদিকদের সারিতে বসেছিলেন।
সম্প্রতি বগুড়া রোডের একটি আবাসিক এলাকায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে মার্কেট নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়। এতে নেতৃত্ব দেন নাসরিন।
নাসরিনের অভিযোগ, এলাকাটি আবাসিক হলেও বাণিজ্যিক স্বার্থে সেখানে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরের সরু সড়ক, ফুটপাত দখল ও সড়কে ভ্রাম্যমাণ বাজার বসানোর মতো সমস্যার সমাধান না করে নতুন মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ উপেক্ষা করে এই মার্কেট নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।
গত ৬ অক্টোবর বরিশাল সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘নজরুল বর্ষ-২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন শিরিন। সেখানে অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিতে আবার প্রাথমিক শাখা চালুর আহ্বান জানান তিনি।
এরপর প্রাথমিক শাখা চালুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একাংশ এর প্রতিবাদ জানায়। এরপর দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিন ইসলাম দাইয়ামের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা অধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেয়। পরে নাসরিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মহানগর বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, শিরিন ও নাসরিনের বিরোধের পাশাপাশি মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব, দলীয় প্রভাব এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
তবে নাসরিন অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পাওয়ার পর শিরিন দলের ভেতরে কোন্দল সৃষ্টি করেছেন। তিনি ভাড়াটে লোক দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদার একজন এবং প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার আরেক নেতাকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করিয়েছেন। এর মাধ্যমে দলকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, কোনো নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডে যেন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়। কিন্তু মহানগর বিএনপির সদস্যসচিবের বিরুদ্ধে দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সিটি প্রশাসক বিভিন্ন জনের কাছ থেকে আনুষঙ্গিক সুবিধা নিয়ে নগরবাসীর দুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন। তার প্রতিবাদ করায় ফিরোজকে সামনে রেখে পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ানো হচ্ছে।
নাসরিন আরও বলেন, ‘কাউকে দানব হয়ে উঠতে এবং দলকে কলুষিত করতে দেওয়া যাবে না। আমি ও মহানগর বিএনপি দলকে বিভক্ত করার চেষ্টা হতে দেব না। যেখানে অনিয়ম ও দুর্নীতি, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’
অন্যদিকে বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন অভিযোগগুলো নাকচ করে বলেন, ‘কারা কী বলেছেন, তাদের আমি চিনি না, কখনো দেখিনি। কে কী অভিযোগ করেছেন, সেগুলো শুনতেও চাই না। কাউকে সমাজে হেয়প্রতিপন্ন করার মতো পারিবারিক শিক্ষা আমি পাইনি। এ নিয়ে আর কোনো কথা শুনতেও চাই না, বলতেও চাই না।’
এসব বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) আবদুস কুদ্দুসুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বরিশালের দুই নারী নেত্রীর মধ্যে অভিযোগ-পাল্টাঅভিযোগ ও কাদা ছোড়াছুড়িকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বলা যায়। তারা দুজনই দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে তা সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু যেভাবে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন, তাতে দল বিব্রত হচ্ছে। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে দলের উচ্চপর্যায় অবগত। এ বিষয়ে তারাই যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবে।
