সমুদ্রের সঙ্গে জড়িয়ে আমাদের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি, খাদ্যশৃঙ্খল। তবে সেই প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে প্লাস্টিকের অপরিমিত ব্যবহার। সমুদ্রে জড়ো হওয়া প্লাস্টিক ভেঙে ক্রমশ ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে তা ঢুকে পড়ে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। প্লাস্টিক বর্জ্যকে শিল্পের ‘উপাদান’ রূপে ব্যবহার করে সমুদ্রদূষণের ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেছে কলকাতার একটি পুজোমণ্ডপ।
শেখর সাহা: উদ্ধার হয়েছিল প্রায় ৪০ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য। ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালে, ফিলিপিন্সের উপকূলে। তিমিটির পেটে পাওয়া গিয়েছিল ১৬টি চালের বস্তা, নানা ধরনের প্লাস্টিকের ব্যাগ, এবং অন্যান্য বর্জ্য। প্লাস্টিকের কারণে খাবার গ্রহণ করতে না-পেরে অনাহার ও জলশূন্যতায় প্রাণ হারিয়েছিল বিশালদেহী প্রাণীটি। খবরটি প্রকাশ করেছিল একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
একবার ভাবুন তো। যে-সমুদ্রের বিশাল বুকে অবাধে বিচরণ করার কথা তার, সেই সমুদ্রেরই বর্জ্য তার ‘মৃত্যুর কারণ’ হয়ে উঠল। মানুষের কয়েক মুহূর্তের অসচেতনতা একটি প্রাণের কাছে হয়ে উঠল আজীবনের অভিশাপ। অথচ প্লাস্টিকটি হয়তো কেউ ব্যবহার করেছিল কয়েক মিনিটের জন্য। তারপর সেটি ফেলে দিয়েছিল যেখানে-সেখানে। সেই ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকই শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল সমুদ্রের গভীরে।
এমন ঘটনা শুধু একটি তিমির মৃত্যুর কাহিনি নয়। এটি আমাদের সভ্যতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক নির্মম প্রশ্ন। আমরা কি উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংসই করে চলেছি কেবল? আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের মূল্য কি দিতে হবে সমুদ্রের নিরীহ প্রাণীদের?
এ প্রশ্নগুলিই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে কলকাতার বালিগঞ্জের ‘৭১ পল্লী বৈশাখী সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি’-র এবারের পুজোর ভাবনা। ২০২৬ সালের দুর্গাপুজোয় তাদের থিম ‘মন্থন দর্পণ’ (বা, সমুদ্রমন্থন)। শিল্পী ধীমান সূতারের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের শিল্পী ফেমকে ভ্যান গেমার্টের (Femke van Gemert) যৌথ প্রয়াসে তৈরি হচ্ছে এই পরিবেশবান্ধব শিল্পভাবনা। প্লাস্টিক বর্জ্যকে শিল্পের ‘উপাদান’ রূপে ব্যবহার করে তাঁরা তুলে ধরছেন সমুদ্রদূষণের ভয়াবহ ছবি। এখানে প্লাস্টিক শুধুই মণ্ডপসজ্জার উপকরণই নয়, তা যেন মানুষের বিবেকের সামনে ধরা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাই নিজেদের আচরণ, আমাদের ভোগবাদী জীবনযাপন, এবং প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বহীনতা। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই প্লাস্টিকের বর্জ্য একের পর এক আছড়ে পড়ছে পৃথিবীর উপকূলে। অথচ সেই ঢেউয়ের শব্দ আমরা শুনতে পাই না। দেখতে পাই না সামুদ্রিক প্রাণীদের নীরব আর্তনাদ।
দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ। আনন্দ, শিল্প, সংস্কৃতি এবং মিলনের এক অনন্য উৎসব। প্রতি বছর কলকাতার পুজোমণ্ডপে ফুটে ওঠে কত বিচিত্র ভাবনা। কখনও ইতিহাস, কখনও পুরাণ, কখনও লোকসংস্কৃতি, কখনও সমাজের নানা সংকট। কিন্তু যখন পুজোর শিল্পভাবনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কোনও জরুরি সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখন সেই শিল্পোৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক দায়িত্বের ভাষা হয়ে ওঠে। ‘মন্থন দর্পণ’ যেন ঠিক সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
সমুদ্রের দিকে তাকানোর আগে নিজেদের দিকে তাকানো প্রয়োজন। আমরা যে প্লাস্টিক ব্যবহার করছি, তার শেষ গন্তব্য কোথায়? ব্যবহারের পর সেটি সঠিকভাবে ফেলা হচ্ছে তো? আমাদের অসতর্কতায় নদী, খাল, নালা ও জলাশয় দিয়ে সেই বর্জ্য সমুদ্রে পৌঁছে যাচ্ছে না তো? সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণ এখন সমগ্র পৃথিবীর পরিবেশের কাছে বড় বিপদ। সামুদ্রিক প্রাণীরা অনেক সময় খাবার ভেবে প্লাস্টিক গিলে ফেলে। কখনও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ও প্লাস্টিকের ফাঁসে আটকে যায় তাদের শরীর। প্লাস্টিক তাদের পরিপাকতন্ত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। খাবার গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে। এমনকী, অনাহারেও মৃত্যু ঘটতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর (NOAA) তথ্যেও সামুদ্রিক বর্জ্যের এমন বিপদের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সমস্যাটি শুধু তিমি বা ডলফিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামুদ্রিক কচ্ছপ, মাছ, সামুদ্রিক পাখি এবং অসংখ্য ছোট প্রাণীও এই দূষণের শিকার। প্লাস্টিক ভেঙে ক্রমশ ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক সামুদ্রিক পরিবেশের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরেও তার উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছে। তবে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
বিপদের শেষ এখানেই নয়। সমুদ্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের জীবন, জীবিকা এবং পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য। মৎস্যজীবীদের জীবিকা, উপকূলবর্তী মানুষের অর্থনীতি, পর্যটন এবং খাদ্যশৃঙ্খল সবই কোনও না কোনওভাবে সুস্থ সামুদ্রিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। তাই সমুদ্রদূষণকে দূরের কোনও সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সমুদ্র থেকে বহু দূরে বসবাস করলেও আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস এই দূষণ বাড়াতে পারে। আমরা রোজ কতভাবে না প্লাস্টিক ব্যবহার করি! বাজারের ব্যাগ, পানীয় জলের বোতল, খাবারের প্যাকেট, একবার ব্যবহারযোগ্য কাপ, প্লেট ও অন্যান্য সামগ্রী। প্রয়োজন মিটে গেলেই সেগুলির অনেক কিছুই চলে যায় আবর্জনার স্তূপে। সেখান থেকে নালা, খাল, নদী পেরিয়ে পৌঁছতে পারে সমুদ্রে। অর্থাৎ সমুদ্রের দূষণের সঙ্গে আমাদের শহর, গ্রাম এবং ঘরেরও সম্পর্ক রয়েছে। তাই সমুদ্রকে প্লাস্টিকমুক্ত করার আন্দোলন শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকেই। অপ্রয়োজনে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলতে হবে। বাজারে গেলে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে। প্লাস্টিকের বোতল ও প্যাকেট যত্রতত্র ফেলা যাবে না। বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করতে হবে, এবং যেখানে সম্ভব পুনর্ব্যবহার ও যথাযথ পুনর্নবীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে।
শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতাই যথেষ্ট নয়। প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে। নদী ও নালায় যাতে বর্জ্য না জমে, তার জন্য নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। উপকূলবর্তী এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। প্লাস্টিক উৎপাদন, ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ম মেনে চলাও জরুরি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। এই জায়গায় ‘সমুদ্র দর্পণ’-এর মতো শিল্পভাবনার গুরুত্ব অপরিসীম।
ধীমান সুতার ও ফেমকে ভ্যান গেমার্টের যৌথ শিল্পভাবনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবেশের সীমান্ত নেই। সমুদ্র কোনও একটি দেশ বা জাতির সম্পত্তি নয়। তার জল, ঢেউ এবং প্রাণের জগৎ পৃথিবীর সকল মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও প্রত্যেকের। শিল্পের ভাষা আলাদা হতে পারে, সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে, কিন্তু প্রকৃতিকে বাঁচানোর আকাঙ্ক্ষা আমাদের একসূত্রে বাঁধতে পারে।
দুর্গাপুজোয় আমরা অসুরবধের কাহিনি স্মরণ করি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের কথা বলি। বর্তমান পৃথিবীতে অসুরের চেহারা অনেক সময় আমাদের নিজেদের কাজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। প্রকৃতিকে অবহেলা, নদীকে দূষিত করা, সমুদ্রকে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করা-এসবের বিরুদ্ধে লড়াইও এক ধরনের অসুরবধ। এই লড়াইয়ে অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং প্রতিদিনের ছোট ছোট পরিবর্তন। প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার না করা হয়তো খুব সামান্য কাজ। কিন্তু কোটি কোটি মানুষ যদি সেই সিদ্ধান্ত নেয়, তার প্রভাবও সামান্য থাকবে না। একটি বোতল সঠিক জায়গায় ফেলা, একটি কাপড়ের ব্যাগ সঙ্গে রাখা, অন্যকে সচেতন করা সবই বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। ‘মন্থন দর্পণ’-এ আমরা যেন শুধু সমুদ্রের সৌন্দর্য না দেখি, তার ক্ষতগুলিও দেখতে শিখি। ঢেউয়ের গর্জনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রাণীদের আর্তনাদ শুনতে শিখি। মনে রাখি, সমুদ্রের ক্ষতি মানে প্রকৃতির ক্ষতি। আর প্রকৃতির ক্ষতি মানে শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করা।
সমুদ্রকে প্লাস্টিকমুক্ত করতে হবে আমাদেরই। সরকার, প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ- প্রত্যেকের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। উৎসবের আলো নিভে যাবে। মণ্ডপ খুলে যাবে। কিন্তু ‘মন্থন দর্পণ’-এর বার্তা যেন আমাদের মন থেকে মুছে না যায়। সমুদ্র বাঁচলে- বাঁচবে সামুদ্রিক প্রাণ। বাঁচবে প্রকৃতি। আর সেই প্রকৃতির বুকেই নিরাপদ থাকবে আমাদের আগামী প্রজন্মের পৃথিবী।
