মঞ্চ, ছোটপর্দা ও চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী সানজিদা প্রীতির জীবনের প্রথম পারিশ্রমিক ছিল ৩০০ টাকার একটি চেক। বিটিভিতে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করে সেটি পেয়েছিলেন।
শিশুশিল্পী থেকে শুরু করে তিনি গেল দুই দশক ধরে টেলিভিশন, চলচ্চিত্রের একজন অভিনেত্রী, হালের ওটিটিতেও কাজ করেছেন। তবে সব মাধ্যমের মধ্যে তিনি বারবার ফিরে যান মঞ্চে। অভিনয় জীবনে মঞ্চই তার কাছে 'নম্বর ওয়ান প্রায়োরিটি'।
কারণ অভিনয়ের স্বাধীনতা প্রীতি সবচেয়ে বেশি খুঁজে পান মঞ্চে। প্রীতির ভাষ্য, বছরের পর বছর একই চরিত্র করেও মঞ্চে নতুন স্তর আবিষ্কার করা যায়, ডালপালা ছড়ানো যায়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের গ্লিটজের সাক্ষাৎকার সিরিজ 'আড্ডানামা'র দ্বাদশ পর্বে অতিথি হয়ে এসেছিলেন অভিনেত্রী। সেখানে তার গল্পে উঠে এসেছে তার অভিনয় জীবনের নানা অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের কাছ থেকে শেখা পাঠ এবং ছেলেবেলার একটি বিশেষ ঘটনাও, যে কারণে এখনো অপরাধবোধে ভোগেন তিনি।
গত দেড় বছরে পর্দায় কাজ কমিয়ে দিয়েছেন সানজিদা প্রীতি। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এই সময়ে এমন কোনো চিত্রনাট্য তার কাছে আসেনি, যা পড়ে মনে হয়েছে 'এটা না করলে জীবন বৃথা'।
তবে এই বিরতিকে তিনি ফাঁকা সময় মনে করছেন না। প্রীতির কথায়, একজন অভিনেতার কাজই অপেক্ষা করা, আর সেই অপেক্ষাও একটা প্রক্রিয়া, যা বয়সে বড় শিল্পীরা তাকে শিখিয়েছেন।
আড্ডানামার সঞ্চালনা করেছেন মঞ্চের অভিনেত্রী নিকিতা নন্দিনী। গ্লিটজের এ আয়োজনে সহযোগিতা করেছে আলোক হেলথকেয়ার এন্ড হাসপাতাল।
আগের এগারো পর্বে অতিথি হয়েছিলেন অভিনেতা আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদ, আফজাল হোসেন, চঞ্চল চৌধুরী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ এবং ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী, শামীম আজাদ, অভিনেতা ইমতিয়াজ বর্ষণ ও পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটের পাশাপাশি ফেইসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামে দেখা যাচ্ছে এ অনুষ্ঠান।
গেল দুই বছরে যা যা ঘিরে প্রীতির ব্যস্ততা
নাট্যদল প্রাচ্যনাটের নিয়মিত নাটকের শোতে অংশ নেন অভিনেত্রী সানজিদা প্রীতি। আড্ডার শুরুতেই মঞ্চ নিয়ে কথা বলেন তিনি।
প্রীতি বলেন, "শো আমরা নিয়মিতই করছি। ২০২৩ সালে আমরা পরপর দুটো নতুন প্রোডাকশন করেছি প্রাচ্যনাটের ব্যানারে। একটা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের 'অচলায়তন', আরেকটা হচ্ছে মহেশ দত্তানির 'আগুনযাত্রা'। তো এই দুটো প্রোডাকশন নিয়ে আপাতত গত দুই বছর ধরে আমরা বেশ ব্যস্ত। প্রায় মানে অল্টারনেটিভ মাসেই করতে হচ্ছে। আর বাকি অন্য যেগুলো আমাদের তো অনেকগুলো প্রোডাকশন, তো সেগুলোরও রেগুলার শো হচ্ছে।"
পথনাটকও তার নাট্যদলের নিয়মিত কাজ বলে জানিয়েছেন প্রীতি; তিনি বলেন, সে কাজেও বিরতি নেই।
প্রাচ্যনাটের 'কইন্যা' বা 'কিনু কাহারের থিয়েটার' এর মত নন্দিত মঞ্চনাটকের অভিজ্ঞতা তাকে কীভাবে সমৃদ্ধ করে, জানতে চাইলে প্রীতি বলেন, "আসলে একেকটা নাটকের সময়ে যেহেতু আমাদের মানে মঞ্চনাটকে একটা দীর্ঘ সময়ের একটা প্রসেসের ভেতর দিয়ে নাটকগুলো আমাদের তৈরি করতে হয়। তো এইটা এক ধরনের আমাদের নরমাল জীবনের একটা পার্ট হয়ে দাঁড়ায় আরকি।
"তো সেই হিসেবে আমি যদি বলি, একজন শিল্পী হিসেবে আমাকে ডেফিনেটলি যে কোনো প্রোডাকশনে নতুন কিছু রপ্ত করতে হয়। জীবনযাত্রার ব্যাপারটা, এটা একেবারে এত ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় যে একটা সময়ে কোনটা থিয়েটার আর কোনটা মানে স্বাভাবিক অন্যান্য কর্মকাণ্ড, এগুলোর ভেতর তেমন কোনো তফাত পাই না।”
'মানুষগুলোর বিশালত্বটাই এমন, ভয়টা লাগত'
প্রীতির প্রথম ধারাবাহিক নাটক 'স্পর্শের বাইরে', যেখানে তিনি কাজ করেছেন সুবর্ণা মুস্তাফা, আফরোজা বানু ও রাইসুল ইসলাম আসাদের মত অভিনয় শিল্পীদের সঙ্গে।
সে সময় কাজ করতে গিয়ে ভয় কাজ করেছিল কি না প্রশ্নে প্রীতি বলেন, "হ্যাঁ, ভয় তো প্রথম দিকে তো খুবই ভয় পেতাম। এমন না যে মানুষগুলো তো রাক্ষস না বা অনেক রাগী ছিল সেরকমও না। কিন্তু মানুষগুলোর বিশালত্বটাই এমন, এত বিশাল মাপের শিল্পী তারা যে ওই ভয়টা লাগত। কিন্তু সেটা অনেক বেশি শ্রদ্ধা থেকেই।"
ওই সব শিল্পীদের সংস্পর্শে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে কীভাবে সহযোগিতা করেছে, সে প্রসঙ্গে প্রীতির ভাষ্য, "একজন অভিনয় শিল্পী হতে গেলে ঠিকমত ডায়লগ দিতে পারা বা এক্সপ্রেশন দিতে পারা, এটাই যে একমাত্র বিষয় না, সেটা আমি শিখেছি ওনাদের কাছ থেকে। ওনাদেরকে দেখে আমি এটা রপ্ত করার চেষ্টা করেছি, এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি যে একজন আর্টিস্ট আসলে কীভাবে বসে, কীভাবে কথা বলে, কি চিন্তা করে, প্রতিদিন তার ডিসিপ্লিনের মধ্যে কি কি থাকে, কীভাবে মানুষের সাথে ইন্টারেকশন করে। এই প্রত্যেকটা জিনিসের মধ্যে না অনেক দায়িত্ব নিয়ে করতে হয়। আমাকে ওই সময়টাতে ওনারা হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছেন।"
দীর্ঘ সময় ধরে টেলিভিশন কাজ করা ধারাবাহিক নাটক 'কাছের মানুষ' এর প্রস্তুতি কেমন ছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মিমি আপুর (আফসানা মিমি) অফিসে আমাদের মেইন যে পরিবারের গল্প, তাদের মেইন যে কাস্ট, লিড কাস্ট যারা ছিলেন তাদেরকে নিয়ে প্রচুর বসা হত, প্রচুর আলোচনা হত। কার চরিত্রের কার মনস্তাত্ত্বিক জায়গাটা কোথায়, হিউজ ডিসকাশন করা হয়েছিল। প্রায় এক বছরের মত সময় লেগে গিয়েছিল প্রি-প্রোডাকশনে।”
'গল্পটা আমার ভালো লাগতে হবে, এটা নাম্বার ওয়ান'
চিত্রনাট্য হাতে পেয়ে কোনো চরিত্রে 'হ্যাঁ' বলার ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়, জানতে চাইলে সানজিদা প্রীতি বলেন, তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল চিত্রনাট্য। এরপর চরিত্র।
মঞ্চে নতুন নাটকের নতুন চরিত্রকে নিজের ভেতরে আনার প্রস্তুতি কেমন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, "প্রথমেই তো আসলে অনুধাবনই করা যায় না। একটা টেক্সট পড়লাম প্রথমে, টেক্সটটা পড়ে এক ধরনের মোটামুটি ধারণা হয় যে চরিত্রটা হয়ত এরকম গম্ভীর বা চঞ্চল বা ইম্যাচিউরড। কিন্তু যখন আমরা ফ্লোরে যাই, ফ্লোরে যাওয়ার পরে অনেক কিছুই চেঞ্জ হয়ে যায়।
"সো চরিত্র ধারণ করার ক্ষেত্রে সবার আগে তো আসলে চরিত্রের রংটা ধরতে পারা খুব জরুরি, কিন্তু সেটা খুব চট করে হয় না।”
ওটিটিতে সানজীদা প্রীতির প্রথম কাজ 'তাকদীর', প্রথম চলচ্চিত্র 'মৃধা বনাম মৃধা'। এরপর মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে কাজ করেছেন '১৯৭১ সেইসব দিন'-এ।
এই তিনটির মধ্যে কোন চরিত্র সবচেয়ে আপন, জানতে চাইলে প্রীতি বলেন, "'তাকদীর'টা সম্ভবত একটু বেশি সাড়া ফেলেছিল ওটিটি প্রোডাকশন হিসেবে। সেভাবে 'তাকদীর' স্পেশাল।
"এদিকে 'মৃধা বনাম মৃধা' আমার প্রথম চলচ্চিত্র, সে ক্ষেত্রে সেটা তো স্পেশাল হবেই। আর '১৯৭১ সেইসব দিন'গুলো, এটা তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো গল্পই তো আমাদের বাঙালি হিসেবে সেটা সবচেয়ে স্পেশাল। মানে ও ধরনের মুক্তিযুদ্ধের কোনো গল্পে কাজ করতে পারা নিঃসন্দেহে ওটা যেকোনো আর্টিস্টেরই জন্য খুব স্পেশাল।"
'সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা মঞ্চে'
অভিনয়ে স্বাধীনতা কোথায় বেশি মনে হয়েছে? প্রীতি বলেন, "মঞ্চে, কারণ যদিও একই চরিত্র করে যাই আমরা বছরের পর বছর। কিন্তু তারপরেও এটার সুবিধাটা হচ্ছে যেহেতু অনেক বারবার করে করে বারবারই ওই চরিত্রটার ভেতরে আরো কিছু লেয়ার আবিষ্কার করা, চিন্তা করলে মঞ্চের স্বাধীনতা বেশি, মানে যত বেশি ডালপালা ছড়ানো যায়।
মঞ্চে নৃত্য, সংগীত, অভিনয়ের পাশাপাশি সেট ডিজাইন ও মেকআপের মত পর্দার পেছনের কারিগরি অভিজ্ঞতা ক্যামেরার সামনে কীভাবে কাজে দেয়, জানতে চাইলে সানজিদা প্রীতি বলেন, "এই অভিজ্ঞতাগুলো ডেফিনেটলি সবার আগে যে প্লাসটা করে, সেটা হচ্ছে যে কোনো কাজ সবাই মিলে করা এবং প্রত্যেকটা ক্রু মেম্বার, সেটা সামনে হোক পেছনে হোক, প্রত্যেকের কাজটা যে খুব ইম্পর্টেন্ট, সেটা বোঝা যায়।”
সিনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে আর এখন তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কাজের পার্থক্য কেমন প্রশ্নে প্রীতি বলেন, "স্পেশালি আমার কাছে মনে হয় এখন ইয়ং যারা কাজ করছে, তাদের জন্য কাজটা একটু কঠিনই আমি বলব। মানে আমাদের জন্য ইজি কেন ছিল, ওই যে সিনিয়ররা ছিলেন আমাদেরকে গাইড করার জন্য। তো এখন নতুন যারা কাজ করছে এবং এখন যে ধরনের স্টোরি আমরা দেখি, সেই স্টোরিতে খুব একটা সিনিয়র আর্টিস্টের ইনভলভমেন্ট আসলে দেখা যায় না।
“সো তার মানে তারা কাজটা তো একাই করছে। কারণ ডিরেক্টর ছাড়া আর ওভাবে তো গাইড করার কেউ নাই।”
কাজ কমিয়ে দেওয়ার কারণ নিয়ে প্রীতি বলেন, " আমার যেসব রিকোয়ারমেন্টস আছে, সেই ধরনের চরিত্র আপাতত লাস্ট দেড় বছরে আমার কাছে এমন কোনো স্ক্রিপ্ট আসে নাই যেটা দেখে ওই যে আমি খুব এক্সাইটেড হয়ে যাব যে, উফ! এটা না করলে তো জীবন বৃথা।
প্রীতি জানিয়েছেন, পর্দায় তাকে দেখা না গেলেও মঞ্চে তার ব্যস্ততা আছে। তার কথায়, ভালো কাজের জন্য অপেক্ষা একজন শিল্পীকে অপেক্ষা করতেই হবে।
“একজন অভিনেতাকে সারাজীবনই অপেক্ষা করতে হয়, কাঙ্ক্ষিত চরিত্র ওভাবে বলাও যায় না। কারণ কেউ কখনো জানে না, কবে কখন কোন চরিত্র কখন কার জন্য খুবই স্পেশাল হয়ে ওঠে।”
কাজের মূল্যায়নে ‘ভিউ’ বিষয়টিও আমলে নেন না প্রীতি। তার কথায়, কাজের মূল্যায়নে এটি কোনো মানদণ্ড হতে পারে না।
প্রীতি মনে করেন শিল্পীর ভেতরে শেখার ক্ষুধা থাকতে হবে, কাজ বাছাইয়ের জ্ঞান ও যোগ্যতাও থাকতে হবে।
মঞ্চ বা ক্যামেরার বাইরে সানজিদা প্রীতি কেমন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, "খুবই নরমাল। আমি অনেক অলস প্রকৃতির।
ছেলেবেলার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কি না, জানতে চাইলে শৈশবের একটি ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ছোটবেলায় তারাবাতি জ্বালাতে খুব ভালোবাসতেন।
একদিন এক প্রতিবেশীর ছাদে গিয়ে তারাবাতি জ্বালানোর সময় ঝুলিয়ে রাখা বেশ কয়েকটি কাপড়ে আগুন লাগিয়ে ফেলেছিলেন এবং ভয়ে পালিয়ে এসেছিলেন।
সেই কাপড়গুলো কার ছিল, তা আজও অজানা থাকলেও ওই ঘটনাটি প্রীতির মনে এখনো গভীর অপরাধবোধ তৈরি করে বলে ভাষ্য তার।।
