আগামী এক দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শুধু মানুষের নির্দেশে কাজ করা প্রযুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ব্যক্তির হয়ে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের বিশাল কর্মীবাহিনী গড়ে উঠতে পারে। এমনকি পৃথিবীতে মানুষের চেয়েও এআই এজেন্টের সংখ্যা বেশি হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভবিষ্যৎবিষয়ক বিশ্লেষক মাইক ওয়ালশ।
আজ এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিট ২০২৬-এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরে ভারত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মাইক ওয়ালশ বলেন, ‘সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তনটি হলো, শিগগিরই পৃথিবীতে মানুষের চেয়ে বেশি এআই এজেন্ট থাকতে পারে। চ্যাটজিপিটি ও অন্যান্য এআই সহকারীর মতো প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা এর প্রাথমিক লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখতে পাচ্ছি। এই পরিবর্তন কীভাবে এগোবে, তাতে ভারত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার হয়ে উঠতে পারে।’
ওয়ালশ একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভবিষ্যৎবিষয়ক বিশ্লেষক। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতাদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ওয়ালশের মতে, ভবিষ্যতের এআই এজেন্টগুলো মানুষের হয়ে শুধু কাজই করবে না, বরং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আর্থিক লেনদেনও সম্পন্ন করতে পারবে।
তিনি বলেন, ‘এই ব্যবস্থাগুলো এআই এজেন্টকে প্রতিবার ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই স্বল্পমূল্যের লেনদেন করার সুযোগ দেবে। এর মধ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যক্তিগত এআইয়ের একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম গড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি হবে।’
এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর হলে দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা পরিচালনা এবং আর্থিক লেনদেনে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণের প্রয়োজন কমে আসতে পারে।
ভারতে প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। অন্যদিকে, পরিবারের জন্য উচ্চশিক্ষার ব্যয়ও একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। এ পরিস্থিতিতে এআইয়ের বিস্তার তরুণদের জন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাইরে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন ওয়ালশ।
সম্ভাব্য পরিবর্তনের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি ভারতের এক মেধাবী কিশোরীর কথা কল্পনা করে তুলে ধরেন।
ওয়ালশ বলেন, ‘এই মুহূর্তে ভারতের কোথাও একজন অত্যন্ত মেধাবী কিশোরী পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে। এক পাশে রয়েছে একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জনের ভর্তির প্রস্তাব। সে ও তার বাবা-মা বছরের পর বছর ধরে এ জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। এতে চার বছর সময় লাগবে এবং বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। এর পাশাপাশি, অনেক কোর্সে এআই ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের একধরনের শাস্তির মুখেও পড়তে হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘অন্য পর্দায় রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। সেখানে একদল এআই এজেন্ট তাকে নতুন একটি ছোট সফটওয়্যার কোম্পানি গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। তারা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করছে, প্রাথমিক নমুনা তৈরি করছে এবং ইতিমধ্যে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে।’
ওয়ালশের মতে, এই দুই পরিস্থিতি তরুণদের সামনে ভবিষ্যতের ভিন্ন দুটি পথ তুলে ধরছে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি হলো, আজ ভারতের অনেক তরুণ হয়তো জীবনের প্রথম চাকরি পাওয়ার আগেই নিজেদের প্রথম ডিজিটাল কর্মী নিয়োগ করবে।’
ওয়ালশ মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বর্তমান আলোচনার বড় অংশজুড়ে রয়েছে সম্পদের ঘাটতি ও কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা। উন্নত এআই ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টারে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও পানি পাওয়া যাবে কি না, প্রযুক্তির কারণে হারিয়ে যাওয়া চাকরির বিকল্প তৈরি হবে কি না এবং প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে কি না—এসব প্রশ্নই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘মজার বিষয় হলো, আজ আমরা এআই নিয়ে যেভাবে কথা বলি, তার বড় অংশই ঘাটতির ধারণা থেকে আসে। আমরা প্রশ্ন করি, প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার চালানোর মতো পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ থাকবে কি না। এআইয়ের কারণে যেসব চাকরি হারিয়ে যাবে, সেগুলোর বিকল্প হিসেবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন থাকি। এমনকি এই সম্মেলনে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারবে কি না, সেটিও ভাবি।’
তবে এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার আরেকটি দিক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সেটি হলো জ্ঞান, দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক প্রাপ্যতা।
ওয়ালশ বলেন, ‘কিন্তু ভাবার মতো আরেকটি জগৎ রয়েছে, আর তা হলো প্রাচুর্যের জগৎ। প্রাচুর্য থেকে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আমরা ততটা অভ্যস্ত নই। ইতিহাসে কতবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যখন জ্ঞান, দক্ষতা এমনকি বুদ্ধিমত্তাও প্রায় সবার কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে—সেই প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করা উচিত।’
এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড সামিটে ওয়ালশের বক্তব্যে উঠে আসে, এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু চাকরি হারানো বা প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ নয়। বরং স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টের বিস্তার শিক্ষা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক কাজের ধরনেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি