কারখানা আছে, যন্ত্রপাতি আছে, শ্রমিকও আছেন। কিন্তু উৎপাদন চালানোর মতো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ নেই। কোথাও কমেছে বিদেশি ক্রয়াদেশ, কোথাও সময়মতো পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, বাড়ছে লোকসানের চাপ। শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারখানা। কর্মহীন হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা। নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এখন সংকটের চিত্রটা এমনই।
দেশের অন্যতম প্রধান নিটওয়্যার শিল্পকেন্দ্র নারায়ণগঞ্জে এই সংকট আর শুধু শিল্পমালিকদের লোকসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর অভিঘাত পড়ছে শ্রমিকের সংসার, বাড়িভাড়া, স্থানীয় বাজার, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়। শিল্পের চাকা ধীর হয়ে যাওয়ায় গোটা এলাকার অর্থনীতিতেই তৈরি হচ্ছে চাপ।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, গত তিন বছরে নারায়ণগঞ্জে ৯১টি নিটিং, ৫৬টি গার্মেন্টস ও ১৩টি প্রিন্টিং কারখানা বন্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ১৬০। একই সময়ে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক বলে জানিয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। এ সংখ্যা শুধু কর্মহীন মানুষের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হাজারো পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়: শিল্প খাতের সংকট আরও গভীর হচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তায়। বিকেএমইএর একটি জরিপের বরাতে জানা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানার ক্রয়াদেশ বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা কমিয়েছে অথবা বাতিল করেছে। ৭৮ শতাংশ কারখানা কোনো না কোনো সময় আংশিক উৎপাদন বন্ধের মুখে পড়েছে। ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে। বিদ্যুৎ-সংকটে পড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান।
জরিপের এসব তথ্য দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে। এখানে তৈরি হয়েছে এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। উৎপাদন ব্যাহত হলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যায় না। চালান বিলম্বিত হলে বিদেশি ক্রেতার আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার ক্রয়াদেশ কমে গেলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণ, কারখানার ভাড়া ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বন্ধ থাকে না। ফলে আয় কমলেও ব্যয়ের চাপ বহন করতে হয় উদ্যোক্তাদের।
গ্যাসের চাপ তলানিতে: ফতুল্লা, পঞ্চবটি, বিসিক শিল্পনগরী, শাসনগাঁও ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাসের স্বল্পচাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নিটিং, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার জন্য গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাপড় রং করা, শুকানো ও নির্দিষ্ট মানে ফিনিশিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় তাপ ও বাষ্প পাওয়া না গেলে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ফতুল্লার কয়েকটি কারখানায় গ্যাসের চাপ মাত্র ১ থেকে ১.৫ পিএসআইয়ে নেমে আসার কথা উঠে এসেছে। কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে, কোথাও যন্ত্রপাতি সচল না থাকায় শ্রমিকদের দিয়ে মেরামত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হয়েছে।
শিল্পমালিকদের উদ্বেগ, গ্যাসের চাপ কখন স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ফলে উৎপাদনের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একটি ডাইং কারখানায় গ্যাসের সংকট দেখা দিলে তার ওপর নির্ভরশীল পোশাক কারখানার উৎপাদনও আটকে যেতে পারে। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট ছড়িয়ে পড়ছে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়।
বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর বা অন্য জ্বালানি ব্যবহার করলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। কিন্তু বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে আগে নির্ধারিত দামে পণ্য সরবরাহের চুক্তি থাকলে বাড়তি ব্যয় সব সময় পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করা সম্ভব হয় না। এতে কমে যায় মুনাফা, সংকুচিত হয় নগদ অর্থের প্রবাহ এবং বাড়ে ঋণ পরিশোধের চাপ।
ফতুল্লার ইউনাইটেড অ্যাপারেল কম্পোজিট লিমিটেডের বন্ধ ঘোষণার ঘটনাও শিল্পাঞ্চলের সংকটকে সামনে এনেছে। বেতন পরিশোধে বিলম্ব, শ্রমিক অসন্তোষ, জ্বালানি সংকট, নতুন ক্রয়াদেশের ঘাটতি ও ব্যাংকিং জটিলতার কথা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। শুধু গ্যাসের সংকট কিংবা শুধু ক্রয়াদেশের ঘাটতিকে দায়ী করে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায় না। কোথাও আর্থিক দুর্বলতা, কোথাও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা, কোথাও শ্রমিক-মালিক বিরোধ সংকটকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এ কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিটি কারখানার পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোন প্রতিষ্ঠান সাময়িক সংকটে পড়েছে, কোনটির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ এবং কোনটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা হারিয়েছে—এসব তথ্য ছাড়া কার্যকর সমাধান বের করা কঠিন।
৬০ হাজার শ্রমিকের জীবিকা: কারখানা বন্ধ হলে প্রথম আঘাত আসে শ্রমিকের আয়ে। নিয়মিত বেতন না পেলে বাড়িভাড়া, খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মহীন শ্রমিকের আয় কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে স্থানীয় মুদি দোকান, খাবারের হোটেল, পরিবহন ও ভাড়া বাসার ব্যবসায়ও।
ফলে শিল্পের সংকট ধীরে ধীরে স্থানীয় বাজারের সংকটে রূপ নেয়। একদিকে কারখানার উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে চাহিদাও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
সমাধান কোথায়? শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলকে স্থিতিশীল করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অবস্থা যাচাই, ব্যাংকঋণ ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, শ্রমিকের বকেয়া মজুরি পরিশোধ এবং শ্রমিক-মালিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। গ্যাসের সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে, কোন শিল্পাঞ্চলে কত ঘাটতি রয়েছে এবং সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা কী—এসব বিষয়ে তিতাস গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা ও শিল্প সংগঠনগুলোর কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের শিল্পকে বাঁচানোর প্রশ্নটি এখন আর কেবল উদ্যোক্তাদের মুনাফার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, শ্রমিকের জীবনযাত্রা এবং একটি বৃহৎ শিল্পাঞ্চলের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। কারখানার উৎপাদন থেমে গেলে তার অভিঘাত যে কত দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, বর্তমান পরিস্থিতি তারই সতর্কবার্তা।
