দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। কমিটি বলেছে, পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতার বাইরে গিয়ে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে মিল রেখে ‘বছরভিত্তিক’ সুনির্দিষ্ট মান পরিমাপ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে শিক্ষা খাতের বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের কৌশল গ্রহণ, অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়া, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো, মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসারে ‘একগুচ্ছ’ প্রস্তাব ও সুপারিশ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যবিবরণীতে দেশের শিক্ষা খাতের জন্য নতুন এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
কমিটির কার্যবিবরণীর তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে ল্যাপটপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে ৭০ লাখ মেয়ে শিক্ষার্থীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বৃত্তির আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি ইএফটি ও আইবাস++ পদ্ধতিতে প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি ব্যাংকে পাঠানোর ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে ধন্যবাদ জানানো হয়।
কার্যবিবরণীর সারসংক্ষেপে আরও জানানো হয়, শর্তপূরণকারী প্রতিষ্ঠান ও প্রবীণ শিক্ষকদের দ্রুত এমপিওভুক্তি, ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করা, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার কারণ জানতে গবেষণা, সংসদ সদস্যদের সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ডের প্রধানদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার শিক্ষা খাতে শুধু সংখ্যার দিক বা পাসের হারের কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার এই কৃত্রিম প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নয়। আমরা চাই দেশে শিক্ষার আসল গুণগত মান নিশ্চিত হোক।
তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে কমিটির প্রথম সভায় একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আমাদের শিক্ষার্থীদের মেলাতে হলে বছরভিত্তিক মূল্যায়ন ও আধুনিক শিক্ষাক্রমের বিকল্প নেই। তাই আমরা চাই শুধু বছরব্যাপী নয়, তিন মাস অথবা ছয় মাস অন্তর শিক্ষাব্যবস্থায় শিখনফল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হওয়া প্রয়োজন। কমিটির আগামীর সভায় শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে আরও দফাওয়ারী সুপারিশ করবে। পাশাপাশি শিক্ষার রোডম্যাপ নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হবে। সেখানে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।’
শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বছরভিত্তিক মূল্যায়ন
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলিত মূল্যায়নব্যবস্থার ওপর পর্যালোচনা করা হয়। কেবল পাসের হার বৃদ্ধি শিক্ষার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না বলেও উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের ওপর জোর দেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার মডেলের ন্যায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা-ভাবনা প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়, যাতে সরকার বা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের মৌলিক কাঠামো বারবার পরিবর্তন না হয়।
সভায় কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া বলেন, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক বিষয়ে আন্তর্জাতিক সূচকে দেশের শিক্ষার্থীরা যেন পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্য সুনির্দিষ্ট বছরভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রবর্তন জরুরি।
বৈঠকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে, যা বিগত সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৪২.৭ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড স্পর্শের অংশ হিসেবে মেধা বিকাশ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে ২০২৬ সালে গোল্ডেন জিপিএ অর্জনকারী প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে একটি করে ল্যাপটপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী শিক্ষার প্রসার ও ঝরে পড়া রোধে ৭০ লাখ ছাত্রীকে ৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বৃত্তির আওতায় আনা হচ্ছে।
কমিটির কার্যবিবরণীতে বলা হয়, শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘদিনের বকেয়া নিরসনে ইতিহাস সৃষ্টি করে বর্তমান সরকার এবারই প্রথম ইএফটি (ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) ও আইবাস++ পদ্ধতিতে দেশের প্রায় ৭০ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীর বকেয়া পাওনা সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর কাজ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ধাপে গড়ে প্রত্যেক শিক্ষককে ৫ লাখ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের কল্যাণ ট্রাস্ট ও অবসর সুবিধার সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়ায় সংসদীয় কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
সেখানে আরো বলা হয়, অতীতে রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে জোর দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদী ও মো. মুজিবুর রহমান এমপিওভুক্তির সকল শর্ত পূরণকারী নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিন ধরে বিনাবেতনে সেবা দেওয়া প্রবীণ শিক্ষকদের বিষয়টি মাথায় রেখে অগ্রধিকারভিত্তিতে দ্রুত এমপিওভুক্তির জোর সুপারিশ করেন। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা দূর করে শিক্ষক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।
কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বিগত সময়ে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এ সকল শিক্ষার্থীরা কোথায় যাচ্ছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার কারণ এবং বর্তমানে তারা কি করছে- তা চিহ্নিত করতে একটি সময়োপযোগী গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর বৈঠকে জোর দেওয়া হয়।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) সামসুর রহমান খান জানান, ২০২৫ সাল পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তা ৩০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
শিক্ষার সার্বিক মান ও নীতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে সংসদ সদস্যরা সরেজমিনে স্কুল-কলেজ পরিদর্শন করবেন এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাবোর্ড ও বিভাগীয় দপ্তর প্রধানদের সশরীরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সুপারিশমালা
সংসদীয় কমিটি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে ৭ দফা সুপারিশ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনে বছরভিত্তিক পরিমাপ পদ্ধতি তৈরি করা। শিক্ষা খাতের বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়তে সংসদীয় কমিটির সদস্যগণ কর্তৃক স্কুল-কলেজ পরিদর্শন। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাবোর্ড ও অধীনস্থ দপ্তর প্রধানদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ। হজ্জযাত্রী ও দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিক্ষকদের বকেয়া দ্রুত মেটাতে আলাদা তালিকা তৈরি। বাজেট সাপেক্ষে বকেয়া ভাতা প্রদান প্রক্রিয়া আরো দ্রুত করা।
সংসদীয় কমিটির এই উদ্যোগ ও সুপারিশকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী হিসেবে দেখছেন দেশের শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, পাসের হারের কৃত্রিম সূচক বাদ দিয়ে বছরভিত্তিক শিখনফল মূল্যায়ন এবং বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের যে তাগিদ সংসদীয় কমিটি দিয়েছে, তা শিক্ষার গুণগত রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এএম
