কারাবন্দি বাবার মুক্তির আকুতি নিয়ে রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিলেন দুই মেয়ে। তাদের হাতে ছিল বাবার মুক্তির আবেদনসংবলিত পোস্টার। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বিজিবি সদস্যরা বাধা দিলেও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন তারা। তাদের দেখে থেমে যায় প্রধানমন্ত্রীকে বহন করা বাস। এ সময় এক মেয়ের হাত থেকে পোস্টারটি নেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনের সময় এ ঘটনা ঘটে। বাগমারা উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুর রশিদ রেন্টুর দুই মেয়ে জারিন তাসনিম রাহি ও সাদিয়া তাহমিন মাহি। তাদের বাবা রেন্টু ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বর্তমানে কারাবন্দি।
মেয়েদের আকুতি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার পর কারাবন্দি নেতার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয় রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটনকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারটিকে আর্থিক সহায়তা ও আইনি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
পরদিন বুধবার নগর ভবনে মাহাবুর রশিদ রেন্টুর স্ত্রী সৈয়দা দিলরুবা আফরোজ এবং তাদের দুই মেয়েকে ডেকে আনান প্রশাসক। এ সময় প্রশাসক তাদের আর্থিক সহায়তা দেন। পাশাপাশি কারাবন্দি মাহাবুর রশিদের মুক্তির জন্য আইনি সহযোগিতা এবং পরিবারের একজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে কারাবন্দি বিএনপি নেতার পরিবারের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছি। পরিবারের একজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেব। কারাগারে তার আইনগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং আইনি বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
জারিন তাসনিম রাহি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে সিটি প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন এবং তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। প্রশাসক আমাদের পাশে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৫ মার্চ রাতে শহরের নিউমার্কেট এলাকায় ছুরিকাঘাতে কলেজছাত্র রাজু আহম্মেদ নিহত হন। রাজু রাজশাহীর দুর্গাপুরের দাওকান্দি ডিগ্রি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি বাগমারা উপজেলার হাসনিপুর গ্রামে। তিনি শহরের মন্নাফের মোড় এলাকায় বন্ধুর সঙ্গে মেসে থাকতেন। এ ঘটনায় মাহাবুর রশিদ রেন্টুসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর রাজু তার কম্পিউটার ঠিক করতে নিউমার্কেটে যান। মার্কেটের পশ্চিম প্রান্তে ‘ভাই ভাই হোটেল’-এর পেছনে আসলে প্রথমে তাকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়। এরপর রিন্টু ওরফে বয়া তার মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। সাজু ও রাজন রাজুর বুকে-পিঠে ছুরি চালান। গুরুতর আহত রাজুকে স্থানীয়রা দ্রুত রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সোয়া ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, বাগমারা উপজেলার মাদারিগঞ্জ বাজার এলাকায় রাজুর একটি মোবাইল সার্ভিসিংয়ের দোকান ছিল। ফাঁসির দণ্ড পাওয়া মাহাবুর রশিদ রেন্টুর বাড়িও সেখানে। রেন্টুর বন্ধু মুক্তার সঙ্গে রাজুর জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। বিরোধের জেরে একবার রাজুর দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়। এ ছাড়া, ৫০ হাজার টাকা চাঁদাও দাবি করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজু মামলা করলে আসামিরা মামলা তুলে নেওয়ার চাপ দিতে থাকে। রাজু মামলা না তুললে তার ওপর হামলা চালায় তারা।
২০২১ সালের ১২ অক্টোবর রাজশাহীর আদালত মামলার রায়ে রেন্টুসহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মামলার এক আসামি মারা যান এবং অন্য নয়জন খালাস পান।
মাহাবুর রশিদের মেয়েদের দাবি, রাজনৈতিক কারণে তাদের বাবাকে ওই হত্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তিনি এখন গুরুতর অসুস্থ। তারা বাবার মুক্তি চান।
রেন্টুর স্ত্রী সৈয়দা দিল আফরোজ বলেন, আমার স্বামী বিএনপি করত। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। তাদের ষড়যন্ত্রে আমার স্বামীকে হত্যা মামলার আসামি করা হয়। ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আমার স্বামীকে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমার স্বামী গুরুতর অসুস্থ। গত দুই মাসে ১২ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে। ডায়াবেটিস ও কিডনির জটিলতাও দেখা দিয়েছে। কিন্তু কোনো চিকিৎসা হচ্ছে না।
