দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার মাস পর্যটকদের দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ থাকছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। তবে দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি।
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে জারি করা নির্দেশনায় পর্যটক ভ্রমণের এ সময়সূচি ও শর্তের কথা জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটক গমন বিষয়ে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় দ্বীপটির পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটক চলাচল ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত চালু থাকবে। পর্যটকবাহী অনুমোদিত জাহাজগুলো কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে চলাচল অব্যাহত রাখবে।
পর্যটকের চাপ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন গড়ে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটকের যাতায়াতের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্বীপে প্রবেশকারী প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায় করা হবে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ২৬ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপে নৌযান চলাচলের অনুমতি দিতে পারবে না।
পর্যটক পরিবহন ও নৌযান চলাচলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবং ট্যুরিস্ট পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা আগের প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাগুলো বহাল থাকবে। ফলে পর্যটক চলাচলের নতুন সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি আগের পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধিনিষেধও কার্যকর থাকবে।
এদিকে, পর্যটন মৌসুম শুরুর খবরে দ্বীপের বাসিন্দা, হোটেল-রিসোর্ট মালিক, নৌযানসংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিধিনিষেধে পর্যটননির্ভর মানুষের আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছিল। নতুন মৌসুমে পর্যটকদের আগমন তাঁদের জীবিকায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ বলেন, “পর্যটকদের সেন্টমার্টিনে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। দ্বীপের বাসিন্দারা অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। পর্যটন মৌসুম চালু হওয়ায় আমরা খুবই খুশি। পর্যটকেরা আনন্দের সঙ্গে দ্বীপে আসতে পারবেন, পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগও বাড়বে। খবর পাওয়া সাথে সেন্টমার্টিনের বাসিন্দারা আনন্দ মিছিল করেন।”
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, “পর্যটন মৌসুম চালু হওয়ায় দ্বীপবাসী অনেক খুশি। গত দুই বছর পর্যটন ভ্রমণে কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় এখানকার মানুষ অনেক কষ্টে দিন কাটিয়েছেন। দ্বীপের মানুষের জীবিকা মূলত পর্যটননির্ভর। নতুন মৌসুমে পর্যটকদের আগমন তাঁদের কষ্ট অনেকটা লাঘব করবে বলে আশা করছি। এ সিদ্ধান্তের জন্য সরকারের প্রতি দ্বীপবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই।”
সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ প্রবাল, পাথুরে সৈকত, শামুক-ঝিনুক এবং সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। কিন্তু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য, শব্দদূষণ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। পর্যটকদের অসচেতনতা ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা দ্বীপটির পরিবেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এ অবস্থায় প্রত্যেক পর্যটকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ের সিদ্ধান্তকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশসচেতন মহল। তাঁদের মতে, এই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হবে এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেসব বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
টেকনাফ উপজেলা জাতীয় নাগরিকপার্টি সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ বাহা উদ্দিন বলেন, “পর্যটকেরা ভ্রমণের জন্য অর্থ ব্যয় করেন, তাই তাঁদের কাছ থেকে অতিরিক্ত এই টাকা নেওয়া হলে তা কোথায়, কীভাবে ব্যয় হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কী সুফল আসবে তার স্বচ্ছ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সেন্টমার্টিনের মানুষের খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত না করে শুধু পর্যটকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করাকে আমি যথেষ্ট যৌক্তিক মনে করি না। শুধু ফি আদায় কিংবা কাগজে-কলমে বিধিনিষেধ জারি করে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের ব্যবস্থা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পর্যটকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।”
টেকনাফ উপজেলা সেক্রেটারি, যুব ও ক্রীড়া বিভাগ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দায়িত্বরত আবদুর রহমান নুরী বলেন, “অতীতে কোনো সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নামে কোনো ফি নেওয়ার রেকর্ড নেই। তাই সেন্টমার্টিন পরিবেশ সংরক্ষণ ফি বাবদ জনপ্রতি ১০০ টাকা করে যে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার এ ফি ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব সেন্টমার্টিন ও দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট করতে হবে।”
এ ফি সেন্টমার্টিন পরিবেশ সংরক্ষণের নামে যেনো সরকার দলীয় নেতা, এমপি-মন্ত্রীদের পকেট ভর্তি না হয়ে যায় তা নিশ্চিত করতে হবে।
এই বিষয়ে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশাকে কয়েকবার ফোন করা হলেও কল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
