মানুষ একই বস্তু দুটি দেখে কেন? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় কোনো একটি জিনিস দুটি দেখার এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ডাবল ভিশন’ বা ‘ডিপ্লোপিয়া’। প্রধানত ডিপ্লোপিয়াকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে— মনোকুলার বা এক চোখের ডিপ্লোপিয়া এবং বাইনোকুলার বা দুই চোখের ডিপ্লোপিয়া। সাধারণত বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে এই স্বাস্থ্য সমস্যাটি বেশি দেখা দিয়ে থাকে। এক চোখ হাত দিয়ে বন্ধ রেখে অন্য চোখ দিয়ে যদি কোনো একটি বস্তু দুটি করে দেখা যায়, তবে তাকে মনোকুলার বা ইউনিকুলার ডিপ্লোপিয়া বলা হয়।
সাধারণত চোখের ছানি, চোখের কর্নিয়ার ব্যাধি কিংবা ম্যাকুলার সমস্যার কারণে এ ধরনের ডিপ্লোপিয়া সৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে, দুই চোখই খোলা রেখে যদি একই বস্তু দুটি করে দেখা যায়, তবে তাকে বলা হয় বাইনোকুলার ডিপ্লোপিয়া।
স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের দুটি চোখই স্বাধীনভাবে কোনো বস্তু শনাক্ত করে, কিন্তু আমরা বস্তুটিকে আলাদা বা দুটি করে দেখি না। এর কারণ হলো, মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চোখের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পেশিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে দুটি চোখের দৃষ্টি কেবল একটি নির্দিষ্ট বস্তুতেই সঠিকভাবে ফোকাস হতে পারে। মস্তিষ্ক তখন দুই চোখের আলাদা তৈরি করা প্রতিচ্ছবি বা ইমেজকে চমৎকারভাবে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি ছবি হিসেবে দেখায়। মস্তিষ্কের এই বিশেষ ক্ষমতার নাম হলো ‘সিঙ্গেল বাইনোকুলার ভিশন’। কিন্তু কোনো কারণে যদি চোখের এই পেশিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল হয়ে পড়ে, কিংবা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতে কোনো জটিলতা তৈরি হয়, তবে দৃষ্টিশক্তিতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তখন কোনো একটি বস্তুকে একই সঙ্গে দুটি, তিনটি, পাশাপাশি কিংবা ওপর-নিচে আছে বলে মনে হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি একই বস্তুর দুটি প্রতিচ্ছবি একটির সাপেক্ষে আরেকটি লম্বা, অনুভূমিক কিংবা আঁড়াআঁড়ি দেখতে পান। চোখের পেশি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি স্নায়ু সুনির্দিষ্ট থাকে, যেমন— অকুলোমটর নার্ভ, ট্রকলিয়ার নার্ভ ও এবডুসেন্ট নার্ভ। এগুলো মস্তিষ্ক থেকে বের হয়ে চোখের কোটরে প্রবেশ করে পেশিতে পৌঁছায়। যাত্রাপথে এ স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে, নিউরোমাসকুলার জাংশনের সমস্যা হলে কিংবা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ঘটলে ডাবল ভিশন হতে পারে।
ডাবল ভিশন দেখা দিলে এর প্রকৃত কারণ দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের ভেতরের কোনো জটিলতার কারণে ডাবল ভিশন হলে তা জীবনের জন্য আশঙ্কাজনক বা বিপজ্জনক হতে পারে। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে— ব্রেইন টিউমার, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ কিংবা মস্তিষ্কের মারাত্মক প্রদাহ। তাই লক্ষণ দেখা দেওয়ার শুরুতেই একজন চক্ষু বা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এছাড়া ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো রোগ থাকলে তা নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন এবং
বিভাগীয় প্রধান, চক্ষুরোগ বিভাগ
আল-রাজী হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা
