জালালাবাদ রিপোর্ট: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ আইনের অধীনে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ে অতিরিক্ত ট্যারিফ নির্ধারণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। পরে আইনটি বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। অবশেষে বিতর্কিত আইনটির অধীনে চুক্তি হওয়া একটি বেসরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ট্যারিফ অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পেরেছে সরকার। এখন নতুন করে চুক্তি হবে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে। এর মধ্য দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং সরকারের বড় অঙ্কের অর্থ সাশ্রয়ের পথ খুলবে বলে আশা করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পর্যায়ক্রমে বিশেষ আইনের অধীনে হওয়া অধিকাংশ বেসরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি পর্যালোচনা ও ট্যারিফ নেগোসিয়েশন করবে বিদ্যুৎ বিভাগের গঠিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্যারিফ পুনর্নির্ধারণ ও নেগোসিয়েশন কমিটি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দ্রুত সম্প্রারণের লক্ষ্যে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২১)’ প্রণয়ন করা হয়। নানা বির্তক ও সমালোচনার মুখে এ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য হিসেবে তৎকালীন সময়ে বারবার বলা হয়েছিল দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল, পছন্দের লোকদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে বিনা টেন্ডারে কাজ দিতে এ আইনের ব্যবহার করেছে সরকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এসে বিশেষ আইনটি বাতিল করে। পরবর্তী সময়ে বিশেষ আইনের অধীনে প্রায় ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও বাতিল করা হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, সেই সময় বিশেষ আইনের অধীনে থাকা প্রকল্পগুলোর ট্যারিফ ও চুক্তি পর্যালোচনা করতে একটি কমিটি গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সেই কমিটি দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। ফলে বর্তমান সরকার একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে আবার নতুন করে একটি কমিটি গঠন করে। উদ্দেশ্যÑ বিশেষ আইনের অধীনের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রকল্পের ট্যারিফ ও চুক্তি পর্যালোচনা।
জানা গেছে, নতুন কমিটি সদ্য বাতিলকৃত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২১)-এর অধীনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পাদিত বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পুনঃপর্যালোচনা করে। এসব পর্যালোচনার মধ্যে তাদের প্রথম কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের ট্যারিফ বা দর প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি নামিয়ে আনতে পেরেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের গঠিত পর্যালোচনা ও নেগোসিয়েশন কমিটি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় নির্মাণাধীন ৩২ মেগাওয়াট (এসি) ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আগে নির্ধারিত এবং চুক্তিকৃত ১৭ মার্কিন সেন্ট প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা থেকে ৯ দশমিক ৯৮ মার্কিন সেন্টে এনে চুক্তি করেছে। বর্তমানে বাজারে মার্কিন ডলার ১২২ টাকা হিসাব করলে আগের চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে প্রায় ২০ টাকা ১৭ পয়সা ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে হতো। নতুন দর অনুযায়ী সেটা ১২ টাকা ৭১ পয়সা নির্ধারিত হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের পর্যালোচনা কমিটি টানা দর-কষাকষি ও পর্যালোচনার পর এই ট্যারিফ প্রায় ৪১ দশমিক ২৯ শতাংশ কমিয়ে প্রতি ইউনিট ৯ দশমিক ৯৮ মার্কিন সেন্ট প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা নির্ধারণ করে স্পন্সর কোম্পানি ‘এইচকেজিই কনসোর্টিয়াম লিমিটেড’-এর সঙ্গে নতুন চুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সূত্রমতে, পর্যায়ক্রমে বিশেষ আইনের অধীনে সম্পাদিত অন্যান্য অসম চুক্তি পর্যালোচনা ও ট্যারিফ নেগোসিয়েশন করবে কমিটি।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিশ্বাস তাতে অনেক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়ে যাওয়া ট্যারিফ কমিয়ে আনা যাবে। এতে করে সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমে আসবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি নতুন দ্বার উন্মোচন হলো। এভাবে উচ্চ ও বর্ধিত দামে চুক্তি করা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ট্যারিফ পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব হলে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, আমরা সবসময় চেয়েছি যে বাংলাদেশে সোলার এনার্জি বা সৌরবিদ্যুতের প্রসার বৃদ্ধি পাক। তাতে করে ফসিল ফুয়েলের ওপর চাপ কমবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ যে তারা সৌরবিদ্যুৎতের প্রসারে অনেক কাজ করছে। অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
বেশি ট্যারিফে চুক্তির পরেও এখন তুলনামূলক কম ট্যারিফে নতুন করে চুক্তি কী করে সম্ভবÑ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসআরইএ সভাপতি বলেন, যেসব প্রকল্প আগে চুক্তি করে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে, সেক্ষেত্রে ট্যারিফ কমানো প্রায় অসম্ভব। তবে যেসব প্রকল্পে চুক্তি হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলোতে অবশ্যই কমানো যাবে। তিনি বলেন, পাঁচ-সাত বছর আগের তুলনায় এখন বিশ্ববাজারে সৌরবিদ্যুতের বিভিন্ন ইকুইপমেন্টের দাম কমেছে। ফলে যেসব প্রকল্প আগে চুক্তি হলেও এখন নতুন করে বাস্তবায়ন করবে তাদের কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, যেহেতু প্রকল্পটির মেয়াদ বারবার পিছিয়েছে, বাস্তবায়ন হয়নি ফলে ট্যারিফ নেগোসিয়েশন সহজ হয়েছে। বাস্তবায়িত প্রকল্পে সেটা সহজ নয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় ৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনের জন্য ২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর লেটার অফ ইনটেন্ট (্এলওআই) ইস্যু করা হয়। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) ও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন চুক্তি বা ইম্পিøমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট (আইএ) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে (সিওডি) আসার কথা।
পরবর্তী সময়ে স্পন্সর কোম্পানির আবেদনের ভিত্তিতে বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ (এলডি) আরোপের শর্তে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিদ্যুৎ বিভাগ মোট ৫ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করে। তবে বৈশ্বিক মন্দা, এলসি খোলায় জটিলতা, হাওর এলাকার বৈরী আবহাওয়া ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মালামাল খালাসে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদনে যেতে পারেনি। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বর্তমানে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৭০ থেকে ৯৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
