লেবার পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মিয়া গোলাম পরওয়ার
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্বতা ও অদূরদর্শী নেতৃত্ব থেকে বিএনপি সরে না আসায় সাত মাসের মধ্যেই সরকার একেবারে লেজেগোবরে জড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্বতা ও অদূরদর্শী নেতৃত্ব থেকে বিএনপি সরে না আসায় সাত মাসের মধ্যেই সরকার একেবারে লেজেগোবরে জড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ে প্রায় চারজন মন্ত্রী-এমপি বিদায় নিয়েছেন। সরকারে থেকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এত অপরিপক্ব, অদক্ষ ও অরাজনৈতিক বক্তব্য এবং নেতৃত্ব আগের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দেখা যায়নি।
গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজার রহমান ইরান। অনুষ্ঠানে ১১ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের বহু ভুঁইফোড় রাজনৈতিক দল নিবন্ধন নিয়েছে। তারা নানা তদবির ও লেজুড়বৃত্তি করেছে। মন্ত্রিত্ব, পদ-পদবি ও ভাগ-বাটোয়ারার কারণে অনেকে দল করেন। কিন্তু অনেক লোভ-লালসার প্রস্তাব সামনে থাকার পরও রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে আপস না করে দেশপ্রেমিক ও আধিপত্যবাদবিরোধী ইসলামী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে লেবার পার্টি একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। এ জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলের পক্ষ থেকে লেবার পার্টির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানান তিনি। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকেও দলটির প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান হয়েছে।
শ্রমিকদের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশে শ্রমিক-মজুরদের অবস্থা ভালো নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের অসন্তোষ, কয়েক দিন পরপর গার্মেন্টস ও শিল্প খাতে অসন্তোষ এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা দেখে বিরোধী দলকে দায়ী করছেন। বলছেন, বিরোধী দলের উসকানিতে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি তার চেয়েও বেশি। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও বেশি। প্রতিনিয়ত জনদুর্ভোগ বাড়ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিক পরিবারগুলো জীবন নির্বাহ করতে পারছে না। গার্মেন্টস শ্রমিকসহ সব পেশার শ্রমিক-মজুরদের বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলন চলছে। এ আন্দোলন থামাতে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের দাবি পূরণ করা সরকারের কর্তব্য।
সরকারকে সতর্ক করে গোলাম পরওয়ার বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান সব অপরাধের বিরুদ্ধে অনমনীয় ও আপসহীন ভূমিকা পালন করছেন। দেশের অস্থিতিশীলতার জন্য তাকে দায়ী করার অর্থ হলো, নিজেদের চাঁদাবাজি, দখলদারি, অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি আড়াল করার আর কোনো পথ না পেয়ে দেশপ্রেমিক বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করা।
তিনি বলেন, “ভেতরে ভেতরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনাদের নেটওয়ার্ক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখছে। আপনারা উত্তরবঙ্গে গিয়ে মঙ্গলবার বলেছেন, পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছেন, এর পেছনে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র আছে।”
গোলাম পরওয়ার প্রশ্ন রেখে বলেন, আওয়ামী লীগ যে গোয়েন্দা বাহিনী ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাপনা রেখে গেছে, সেই ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এখন বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে কি না, তা সরকারকে ভেবে দেখতে হবে। তার অভিযোগ, অতীতে ওই গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে জঙ্গী বানিয়ে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়েছে, রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং আয়নাঘরে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, “যে পুলিশ বাহিনীর সেটআপ যারা রেখে গিয়েছিল, সেইসব গোয়েন্দা বাহিনী, সেইসব গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এখনো আপনি সরাননি।”
তিনি আরও বলেন, সরকারের অপকর্ম ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বললে বিরোধী দলকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। অথচ বিরোধী দলের দায়িত্বই হলো সরকারের অপকর্ম জাতির সামনে তুলে ধরা। তাহলে কি কিছুই বলা যাবে না? এটিই তো ফ্যাসিবাদের পথ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার দোষ কী ছিল? তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হতো। নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে জঙ্গী বানিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো। সরকারও সেই খারাপ পথেই যাত্রা শুরু করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সরকার বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করতে চায় অভিযোগ করে তিনি বলেন, অতীতেও দলীয়করণ দেখা গেছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ও চিফ হুইপরা প্রকাশ্যে দলীয়করণের কথা বলছেন। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বরগুনায় গিয়ে বলেছেন, সব ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীকে জয়ী না করলে উন্নয়নের কোনো বরাদ্দ দেওয়া হবে না। একজন মন্ত্রীর পদমর্যাদায় থাকা চিফ হুইপ কিংবা সংসদীয় দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির এমন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ আছে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সাত-আট মাস পার হলেও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দল এখন পর্যন্ত যে আন্দোলন করেছে, তাতে দুটি লংমার্চ হয়েছে। আগামী ৩১ অক্টোবর আরেকটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এ সময়ের মধ্যে সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে, সার-সংকট তৈরি হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। খুন, ধর্ষণ ও নৃশংসতার ঘটনাও সীমা ছাড়িয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দলীয়করণের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির লোকজনকে বেছে বেছে বসানো হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধে বিরোধী দল আন্দোলন করলেও এক দিন হরতাল বা অবরোধ করেনি, কোনো গাড়িতে আগুন দেয়নি কিংবা ভাঙচুর করেনি। এরপরও সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে অস্থিতিশীলতা হিসেবে দেখছে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, “৭০ ভাগ মানুষের গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা, এত বড় বেইমানি করা একটি শাসক দলের বিরুদ্ধে এখনো আমরা কোনো সহিংস আন্দোলন করিনি। কারণ আমরা দেশকে ভালবেসে দেশকে অস্থিতিশীল হতে দিইনি।”
তিনি বলেন, এখনো সরকারের সময় আছে। সংসদের বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য কমিশনে যে প্রস্তাব হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের সেই সুযোগ দিচ্ছি, আসুন আলোচনা করি।”
গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা বিশ্বাস করতে চান, বিএনপিও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছিল। গণভোটের ব্যালটের চারটি প্রশ্নে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে ঐকমত্যের ৮৪টি বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। তার দাবি, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের ভোটের মধ্য দিয়ে বিএনপির সব নোট অব ডিসেন্ট খারিজ হয়ে গেছে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের গণরায় মেনে নিয়ে দেশকে স্থিতিশীল রাখার দায়িত্ব এখন সরকারের।
জুলাই সনদ ও জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী জুলাই সনদকে ধারণ করে। জুলাই শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারগুলোর কাছে জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা চিকিৎসা ও সহায়তা নিয়ে গিয়েছেন। সরকারি দলের কতজন শহীদের বাড়িতে গিয়েছেন এবং কতজন জুলাই যোদ্ধাকে সেবা দিয়েছেন, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, যারা জুলাইকে ধারণ করে, তারা কি গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায় প্রত্যাখ্যান করতে পারে? সংসদে গণভোটকে বাতিল করার অর্থই হলো জুলাইয়ের আকাক্সক্ষাকে ধারণ না করা।
সরকারকে দেশকে অরাজকতা ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে অশান্তি তৈরি করে রাজপথ উত্তপ্ত করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করলে ভুল রাজনীতির কারণে আওয়ামী লীগকে আবার রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, অতীতে বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে ছিল। আজও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে ৭০ শতাংশ মানুষের রায় সবাই একসঙ্গে মেনে নিলে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পেত না।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-যশোর-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া রুটে তৃতীয় দফার লংমার্চে দেশবাসীকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।
লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট জোহরা খাতুন জুঁইয়ের পরিচালনায় সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বিডিপির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নায়েবে আমীর মাওলানা মাহবুবুল হক, জাগপা সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন প্রধান, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট ড. আওরঙ্গজেব বেলাল। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুখপাত্র মোঃ নাজমুল ইসলাম মামুন, ভাইস চেয়ারম্যান এস এম ইউসুফ আলী, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, যুগ্ম মহাসচিব মোঃ হেলাল উদ্দিন চৌধুরী, মুফতি তরিকুল ইসলাম সাদি, সাংগঠনিক সম্পাদক মেজবাউল ইসলাম সজিব, ফেরদৌস আলম, দফতর সম্পাদক মোঃ মিরাজ খান, মহিলা সম্পাদিকা নাসিমা নাজনীন সরকার, যুবমিশন আহ্বায়ক সালমান খান বাদসা, ছাত্রমিশন সভাপতি সৈয়দ মোঃ মিলন, ঢাকা মহানগর লেবার পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ মাসুদ পাটোয়ারী, গোলাম আজম, আহসান হাফিজ, যশোর জেলা সদস্য সচিব মোঃ রাজ্জাকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় সদস্য মোঃ এনামুল হক, ছাত্র মিশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ মোঃ মিলন, সাধারণ সম্পাদক মোঃ নাজমুল ইসলাম মামুন ও মহানগর সদস্য সচিব মোঃ সিয়াম মোল্লা প্রমুখ।
