সরকারের কাছে দাবি, আমার মেয়েকে জীবিত-মৃত্যু আমার কাছে আইনা দাও। সরকারের কাছে আমার সুইটিকে ভিক্ষা চাই। আমার স্বামী এখনো দিনমজুরির কাজ করে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের পাঁচটা মেয়ে দিয়েছে। সুইটিকে বিয়ে দিয়েছিলাম, সেখানে সংসার টিকলো না। বিয়ে আর করবে না এইজন্য ধার-দেনা করে বিদেশ পাঠালাম। তার কপালে যে এমনটা হবে বুঝতে পারি নাই। সরকারের কাছে অনুরোধ–আমার সুইটিকে ভিক্ষা চাই। এমন করেই কথাগুলো বলছিলেন সুইটি আক্তারের মা জহুরা বেগম।
সৌদি আরবের মসজিদ কম্পাউন্ডে বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে গত ১৪ অক্টোবর সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। একই অভিযোগে আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় নজরুলের।
সুইটি আক্তার (২৫) টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামের ফজল মিয়ার ছোট মেয়ে। ৫ বোনের মধ্যে সুইটি সবার ছোট। এদিকে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর নজরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের আব্দুল বাছির ও রহিমা বেগম দম্পতির সন্তান।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, অসহায় পরিবারের হাল ধরতেই সাড়ে তিন বছর আগে সৌদি আরবে যান সুইটি আক্তার। দেড় লাখ টাকা ধার-দেনা করে দালাল ধরে সৌদি আরবে পাঠান সুইটি আক্তারের বাবা ফজল মিয়া। সৌদি গিয়ে ৫ মাস বাড়িতে টাকাও পাঠায় সুইটি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদের পর ২০২৩ সালে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমায় সুইটি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজের কথা বলে তাকে পাঠানো হয় বলে দাবি স্বজনদের। এ জন্য দালাল নতু মিয়াকে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তারা।
পরিবারের সদস্যরা জানায়, সৌদি আরবের মক্কায় আল মাজাল আল আরবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন সুইটি। দেশটিতে পৌঁছানোর প্রায় ছয় মাস পর গ্রেপ্তার হন তিনি। তবে গ্রেপ্তারের খবর পরিবার জানতে পারে প্রায় এক বছর পর। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সুইটিই তাদের আটকের বিষয়টি জানান। সুইটি পরিবারকে মারামারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে বললেও প্রবাসে থাকা তার এক বান্ধবী জানায় এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল বলেন, আমরা শুনেছি মক্কা শরীফে কাজ করে। কাজ করে হয়তো ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে ছিল। সরকার হয়তো খারাপ কিছু পেয়েছে। সেইজন্য সৌদি সরকার জেলে তাকে দিয়েছে। এখন শুনছি যে মেয়ের নাকি ফাঁসি হয়েছে। এই মেয়ে কিনা তা আমরা বলতে পারবো না। মেয়ের বাবা খোঁজ খবর নিয়েও সঠিক তথ্য পাচ্ছে না। মেয়ের মা নাকি ৭-৮ দিন আগে কথা বলছে। এই মেয়ে যদি সেই মেয়ে হয়ে থাকে তাহলে সরকার যেন দ্রুত আনার ব্যবস্থা করে।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, সাড়ে তিন বছর আগে দেড় লাখ টাকা ধার-দেনা করে মেয়েকে সৌদি আরবে পাঠাই। প্রথম ৫ মাস বাড়িতে টাকাও পাঠাই। পরে সে ফোন করে বাড়িতে জানায় কারাগারে নেওয়া হয়েছে। কারাগারে আছি, আমার জন্য চিন্তা করো না।
তিনি বলেন, বিদেশে ৬ মাস থাকতে কারাগারে যায়। আড়াই বছর ধরে জেলে আছে। ১৫ দিন আগেও আমার মেয়ে ফোন করেছিল, মায়ের সঙ্গে কথা বলছে।
আমাদের এখন সরকারের কাছে আবেদন– আমার মেয়ে চাই। আমার মেয়ে যেন সরকার আইনা দেয়।
মহেড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাস সরকার নুপুর বলেন, বিষয়টি শুনতে পেরেছি। এই মেয়ে সেই মেয়ে কিনা– এটা তো আমি জানি না।
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সুইটির শিরশ্ছেদের ঘটনায় জড়িত রয়েছে কিনা সেই বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সুইটির বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার ব্যাপারে তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জহিরুল আলম বলেন, অফিসিয়ালি এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পায়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পেয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য খোঁজ নেয়া হবে।
আরিফুল ইসলাম/এইচএস
