দীপশুভ্র সান্যাল: জলপাইগুড়ি
শারদীয়া উৎসবের আনন্দে মেতেছে শহর। মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ভিড়, আলোর রোশনাই আর কেনাকাটার ব্যস্ততা। এই উৎসবের আবহেই শহরের রাস্তায় রাস্তায় কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন একদল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ঝুড়িতে সাজানো রঙিন খেলনা নিয়ে তাঁদের এক রাস্তা থেকে অন্য রাস্তায় ছুটে চলা। লক্ষ্য একটাই—উৎসবের মরশুমে দু’পয়সা বাড়তি রোজগার।
টমটম গাড়ি, ছোট ঘোড়া, রঙিন মুখোশ, পাখি, বাঘের মুখোশ-সহ নানা ধরনের ছোট খেলনা নিয়ে জলপাইগুড়ি শহরে হাজির হয়েছেন ভিন জেলার এই ব্যবসায়ীরা। সারা বছর তেমন বিক্রিবাটা না থাকলেও শারদীয়া উৎসবের দিনগুলিতে কিছুটা বাড়তি আয়ের আশায় প্রতিবছর তাঁরা শহরে আসেন। সন্ধ্যা নামতেই বিভিন্ন রাস্তা ও জনবহুল এলাকায় ঘুরে ঘুরে ক্রেতা খুঁজতে দেখা যায় তাঁদের। ছোটদের আকৃষ্ট করতে ঝুড়িতে সাজানো খেলনা দেখিয়ে ডাক দেন পথচারীদের।
কিন্তু উৎসবের বাজারে মানুষের ভিড় বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না বিক্রি। আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে শিশুদের খেলাধুলার ধরন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। বাজারে এসেছে নানা ধরনের ইলেকট্রনিক খেলনা, আর মোবাইল ফোনও হয়ে উঠেছে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পিছিয়ে পড়ছে রাস্তার ধারে বিক্রি হওয়া স্বল্পমূল্যের খেলনা। ব্যবসায়ীদের আক্ষেপ, একসময় যে খেলনাগুলি শিশুদের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল, এখন সেগুলির চাহিদা অনেকটাই কমেছে।
তারপরেও হাল ছাড়তে নারাজ তাঁরা। অল্প দামের খেলনা কিনে দেওয়ার জন্য অনেক অভিভাবক এখনও সন্তানদের আবদার মেটান। কোনও শিশু রঙিন মুখোশ দেখে থমকে দাঁড়ায়, কেউ আবার ছোট গাড়ি কিংবা ঘোড়া হাতে পাওয়ার আশায় অভিভাবকের কাছে বায়না ধরে। সেই সামান্য বিক্রির আশাতেই একের পর এক রাস্তা ঘুরে বেড়ান খেলনা বিক্রেতারা।
এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে শারদীয়া উৎসব শুধু আনন্দের সময় নয়, সংসারের খরচ চালানোর জন্য কিছুটা বাড়তি অর্থ উপার্জনেরও সুযোগ। প্রতিদিনের যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ সামলে কতটা লাভ থাকবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। বিক্রি কম হলে সেই আয় আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবুও উৎসবের কয়েকটা দিন যদি কিছুটা বেশি বিক্রি হয়, সেই আশাতেই প্রতিদিন ঝুড়ি কাঁধে পথে নামছেন তাঁরা।
শহরের উৎসবের চাকচিক্যের আড়ালে এই মানুষগুলির লড়াই খুব একটা চোখে পড়ে না। অথচ তাঁদের সাজানো ছোট ছোট খেলনা ঘিরেই কোথাও কোথাও তৈরি হয় শিশুদের আনন্দ, ফিরে আসে অনেকের শৈশবের স্মৃতি। আধুনিকতার দাপটে পুরনো দিনের খেলনার কদর কমলেও, জীবিকার তাগিদে সেই খেলনাগুলিকেই সম্বল করে পথে পথে ঘুরছেন তাঁরা। শারদীয়া উৎসবের ভিড়ে তাঁদের প্রত্যাশা সামান্য—কিছুটা বিক্রি, কয়েকটি বাড়তি টাকা, আর সেই আয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো।
