এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক হয়েও নিজ বাসভবনে পরিবার-পরিজন নিয়ে এক প্রকার ‘গৃহবন্দি’ জীবনযাপন করছেন। হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, রুল জারি এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের ইতিবাচক সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও মিলছে না মাত্র তিন থেকে চার ফুট যাতায়াতের একটি পকেট গেট বা বিকল্প পথ।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলা প্রশাসন চত্বরের চারপাশ ঘিরে সম্প্রতি নির্মিত উঁচু সীমানা প্রাচীরের কারণে গত কয়েক মাস ধরে এই চরম মানবিক ট্র্যাজেডি ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে অসহায় পরিবারটি।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাতক্ষীরার তালা উপজেলার আটারই গ্রামের বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সরদার সাইফুল ইসলাম তার চাকরিজীবনের সঞ্চিত সম্বল দিয়ে উপজেলা প্রশাসন চত্বর সংলগ্ন নিজস্ব জমিতে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। ভবনটি নির্মাণের সময় উপজেলা চত্বরটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিল এবং কোনো ধরনের সীমানা প্রাচীর ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সাইফুল ইসলামের পরিবার ও তাদের ভবনের ভাড়াটিয়ারা ওই পথ দিয়েই নির্বিঘ্নে ও স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করে আসছিলেন।
সম্প্রতি তালা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো চত্বর ঘিরে সীমানা প্রাচীর (বাউন্ডারি ওয়াল) নির্মাণ করায় ঘটে চরম বিপত্তি। প্রাচীর নির্মাণে সাইফুল ইসলামের বাড়ি থেকে বের হওয়ার একমাত্র স্বাভাবিক যাতায়াতের পথটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো বিকল্প রাস্তা না থাকায় পরিবারটি নিজ ভূমিতেই ‘গৃহবন্দি’ ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। দৈনন্দিন বাজারঘাট, জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া কিংবা সন্তানদের বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা—সবই এখন তাদের জন্য এক দুঃস্বপ্ন।
অনাকাঙ্ক্ষিত এই চরম দুর্ভোগ ও মানবিক সংকট থেকে পরিত্রাণ এবং যাতায়াতের মানবিক পথ সুগম করতে ভুক্তভোগী সরদার সাইফুল ইসলাম গত ২৪ এপ্রিল-২৬ তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর চলাচলের জন্য ৭-৮ ফুটের একটি ‘পকেট গেট’ বরাদ্দের জন্য লিখিত আবেদন জানান। ওই আবেদনে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কোলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ্ মানবিক বিষয়টি অনুধাবন করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ইতিবাচক সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করেন।
সংসদ সদস্যের সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরবর্তীতে প্রতিকার চেয়ে গত ২২ জুলাই জেলা প্রশাসক বরাবর পুনরায় লিখিত আবেদন জানান। তাতেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন বা সুরাহা মেলেনি।
প্রশাসনের কাছে কোনো প্রতিকার না পেয়ে বাধ্য হয়ে আইনি আশ্রয়ের জন্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নং-৯৮২০/২৬) দায়ের করেন ক্ষুব্ধ সরদার সাইফুল ইসলাম। রিট আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ স্থানীয় সরকার (এলজিইডি) সচিব, সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক, তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুই সপ্তাহের সুনির্দিষ্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞ আদালত আবেদনকারীর পূর্বের লিখিত আবেদনগুলো ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির আইনি নির্দেশ দেন।
কিন্তু আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা এবং রুল জারির পরও কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও বাস্তবে চলাচলের কোনো পথ বা পকেট গেট পাননি ভুক্তভোগীরা। প্রশাসনের এই উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে রিট আবেদনকারী সরদার সাইফুল ইসলাম আকুতি জানিয়ে বলেন, ‘জীবনের সমস্ত উপার্জন দিয়ে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়েছিলাম। আজ পরিবার ও ভাড়াটিয়াদের নিয়ে নিজ ঘরেই এক প্রকার বন্দি জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কিংবা স্বাভাবিক চলাচলের মৌলিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আদালতের স্পষ্ট আদেশ থাকার পরও আমরা বিচার পাচ্ছি না—এর চেয়ে কষ্টের ও উদ্বেগের বিষয় আর কী হতে পারে?’
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহিন হোসেন অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয়বিদারক, যা খালি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। বাড়ির মালিক সাইফুল ইসলামসহ তার পুরো পরিবার সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
বাড়ির মালিক সাইফুল ইসলামকে প্রাচীরের নিচ দিয়ে হামাগুঁড়ি দিয়ে বা দেয়াল ডিঙিয়ে বাইরে আসতে হচ্ছে। পরিবারের অন্য কোনো সদস্য বা নারী-শিশুরা কোনোভাবেই বের হতে পারছেন না। কেবল একটি পকেট গেটের অভাবে একটি পুরো পরিবার অবরুদ্ধ থাকবে—তা কোনো সুস্থ সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।’
তিনি দ্রুত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।
এদিকে, হাইকোর্টের আদেশ কার্যকর না হওয়া এবং একটি অসহায় পরিবারের দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ অবস্থা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য জানতে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের অফিশিয়াল কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রশাসনের এহেন উদাসীনতায় স্থানীয় সচেতন মহলেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে যাতায়াতের মানবিক পথটি উন্মুক্ত করে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য ভুক্তভোগী পরিবারটির সাথে সাথে স্থানীয় এলাকাবাসী সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সরকার (এলজিইডি) মন্ত্রণালয়ের আশু হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করেছেন।
