সাদা বলের ক্রিকেটে এমনিতে আগ্রাসী ব্যাটসম্যান হিসেবেই পরিচিত সাব্বির রহমান। তবে এবার তার দায়িত্ব ছিল ভিন্ন। ক্রিজ আঁকড়ে রাখার সেই কাজ দারুণভাবেই করে তিন অঙ্কে পৌছে প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটালেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।
জাতীয় ক্রিকেট লিগে সাব্বিরের ম্যাচ বাঁচানো সেঞ্চুরির দিনে শতরানের স্বাদ পেলেন আশরাফুল হাসান ও আশিকুর রহমানও। আর বল হাতে ৫ উইকেট নিলেন আরেক আশরাফুল হাসান। একই ম্যাচে ২০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করলেন হাসান মুরাদ।
প্রথম রাউন্ডের মতো এবারও ড্র হয়েছে তিনটি ম্যাচ। ফল এসেছে শুধু বরিশালের ম্যাচে। প্রথম ম্যাচের মতো এবারও হেরেছে তারা।
রাজশাহীর নাটকীয় ড্রয়ে সাব্বিরের সেঞ্চুরি
খুলনার বিপক্ষে আগের দিনই ইনিংস পরাজয় এড়ানোর পথে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল রাজশাহী। শেষ দিনে তাদের সামনে ছিল ম্যাচ বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ। একপ্রান্ত আগলে রেখে ম্যাচ ড্র করায় বড় অবদান রাখার পাশাপাশি সেঞ্চুরির দেখাও পেয়েছেন সাব্বির।
ম্যাচ শেষ হওয়ার ঘণ্টা দেড়েক বাকি থাকতে ড্রেসিং রুমে ফেরার আগে ৮ চার ও ১ ছক্কায় ২২১ বলে ১১৩ রানের ইনিংস খেলেন সাব্বির। ৮৪ ম্যাচের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে এটি তার পঞ্চম সেঞ্চুরি।
এই সংস্করণে এর আগে সাব্বিরের সবশেষ সেঞ্চুরি ছিল প্রায় সাড়ে ৮ বছর আগে। ২০১৮ সালের জুনে শ্রীলঙ্কা 'এ' দলের বিপক্ষে ১৬৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। মাঝের ৫৯ ইনিংসে আর তিন অঙ্ক ছোঁয়া হয়নি তার।
জাতীয় লিগে সেঞ্চুরির অপেক্ষা ছিল আরও দীর্ঘ। সেই ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সিলেটের বিপক্ষে করেছিলেন ১৩৬ রান।
সাব্বিরের অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটানোর দিনে দুই দফায় ম্যাচ জেতার সম্ভাবনা জাগায় খুলনা। ৩ উইকেটে ৩০০ রান নিয়ে দিন শুরু করে ৭৯ রানের মধ্যে আরও ৩ উইকেট হারায় রাজশাহী। তাদের লিড তখন মাত্র ১৪ রানের।
কঠিন পরিস্থিতিতে তখন সানজামুল ইসলামের সঙ্গে জুটি বাধেন সাব্বির। সপ্তম উইকেটে দুজন মিলে যোগ করেন ৯৫ রান।
৩৯ রান করা সানজামুলকে ফিরিয়ে জুটি ভাঙেন আফিফ হোসেন। একই ওভারে ফিরতি ক্যাচে তার শিকার নিহাদ উজ জামান।
পরের ওভারে শেখ পারভেজ রহমানের লেগ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে কট বিহাইন্ড হয়ে ফেরেন সাব্বির। ৬ বলের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের শঙ্কায় পড়ে রাজশাহী।
তবে তা হতে দেননি আলি মোহাম্মদ ও শফিকুল ইসলাম। দশম উইকেট জুটিতে দুজন মিলে কাটিয়ে দেন এক ঘণ্টার বেশি সময়। ১০৮ বলে তারা যোগ করেন ২৬ রান। আলি ৫০ বলে ১১ ও শফিকুর ৫৮ বলে ১৫ রানে অপরাজিত থাকেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
রাজশাহী ১ম ইনিংস: ১১৯
খুলনা ১ম ইনিংস: ৪৮৪
রাজশাহী ২য় ইনিংস: (আগের দিন ৩০০/৩) ১৬৩.৩ ওভারে ৫০০/৯ (প্রিতম ৪৪, সাব্বির ১১৩, মেহেরব ১৩, শাকির ৮, সানজামুল ৩৯, নিহাদ উজ জামান ০, আলি ১১*, শফিকুল ১৫*; সফর ১৯-৬-৫৭-০, হালিম ১২-২-৫০-০, মেহেদি ৪৭-৭-১৪৮-৪, পারভেজ ২৭-৪-৮০-১, আফিফ ১১.৩-০-৩১-২, আজিজুল ২-০-৮-০)
ফল: ম্যাচ ড্র
ম্যান অব দা ম্যাচ: শেখ মেহেদি হাসান
আশরাফুলের ৫ উইকেট, মুরাদের ২০০
দ্বিতীয় রাউন্ডে ফল এসেছে শুধু বরিশাল ও চট্টগ্রামের ম্যাচে। আশরাফুল হাসানের চমৎকার অফ স্পিনে বরিশালকে ইনিংস ও ১ রানে হারিয়েছে চট্টগ্রাম।
শেষ দিন ইনিংস পরাজয় এড়াতে বরিশালের করতে হতো ১৪৫ রান। তাদের বাকি ছিল ৬টি উইকেট। এদিন ৫৬ ওভারে ১৪৪ রান করতে বাকি ৬ উইকেট হারায় দলটি।
রাফসান আল মাহমুদ ৭ চার ও ২ ছক্কায় ৭২ রান করে। শেষ দিকে ৩৬ রানে অপরাজিত থাকেন মইন খান। তবু দলের টানা দ্বিতীয় ইনিংস পরাজয় এড়াতে পারেননি তারা।
বরিশালের ব্যাটিং লাইনআপকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে ৭৭ রানে ৫ উইকেট নেন আশরাফুল। ১১ ম্যাচের ক্যারিয়ারে এটি তার তৃতীয় ৫ উইকেট।
দুই ইনিংসে মিলিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে ২০০ উইকেট পূর্ণ করেছেন মুরাদ। ৪৭ ম্যাচের ৭৮ ইনিংসে মাইলফলক স্পর্শ করেছেন বাঁহাতি স্পিনার। ইনিংসে ১৪ বার ৫ উইকেট নিয়েছেন তিনি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বরিশাল ১ম ইনিংস: ২৮২
চট্টগ্রাম ১ম ইনিংস: ৫৭৬
বরিশাল ২য় ইনিংস: (আগের দিন ১৪৯/৪) ১১৫ ওভারে ২৯৩ (রাফসান ৭২, মইনুল ৪১, হাফিজুর ১৮, মইন ৩২*, রুয়েল ০, মোজাম্মেল ১, অভি ০; শরিফ ১৫.৫-১-৬৪-০, এনামুল ৮.১-০-২৯-১, রুবেল ২৩-৯-৪১-২, আশরাফুল ৩৭-১০-৭৭-৫, মুরাদ ২৮-৬-৬১-২, জয় ৩-০-১০-০)
ফল: চট্টগ্রাম ইনিংস ও ১ রানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: সাদিকুর রহমান
মাহফিজুলের আরেকটি ফিফটি
প্রথম ম্যাচে দুই ইনিংসেই পঞ্চাশ পেরোলেও দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম ইনিংসে অল্পতেই ফিরে গিয়েছিলেন মাহফিজুল ইসলাম। তবে আরেকবার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়ে আবার পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংস খেললেন ময়মনসিংহের তরুণ ওপেনার।
সিলেটে একাডেমি মাঠে ফল আনার চেষ্টা করেও সফল হয়নি সিলেট। মাহফিজুলের পাশাপাশি আল আমিনের ফিফটিতে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়ে ময়মনসিংহ।
শেষ দিনে ৮.২ ওভারে ৫০ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে দেয় রংপুর। ময়মনসিংহের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩৭৩ রানের। জয়ের দিকে ছোটার চেয়ে দিনের বাকি ৭৯ ওভার কাটিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের জন্য বেশি বাস্তবসম্মত।
সেই অভিযানে ৬ চার ও ২ ছক্কায় ১০৮ বলে ৬৮ রান করেন মাহফিজুল। তবু দলের একশ হওয়ার আগে তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে ফিরে যান তিনি। তখনও দিনের বাকি ছিল ৪৫ ওভার।
চতুর্থ উইকেটে ১৬৫ বলে ৯৩ রানের জুটি গড়েন আল আমিন ও আব্দুল মজিদ। এই জুটিই মূলত শেষ করে দেয় রংপুরের জয়ের সম্ভাবনা। ফলে দিনের এক ঘণ্টা বাকি থাকতে ড্র মেনে নেয় দুই দল।
মজিদ ৩৯ রান করে আউট হন। ১০ চারে ৯৭ বলে ৫৫ রানে অপরাজিত থেকেন আল আমিন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
রংপুর ১ম ইনিংস: ৪২২/৯ডি.
ময়মনসিংহ ১ম ইনিংস: ২৯৫
রংপুর ২য় ইনিংস: (আগের দিন ১৯৫/৬) ৬০.২ ওভারে ২৪৫/৬ডি. (নবীন ১৯*, হাশিম ৪১*; গালিব ৯.২-০-৫৩-২, আবু হায়দার ১২-০-৫৭-১, আজিজুল ১৪-৬-১৭-১, রিজান ৬-১-১৬-১, আলআমিন ২-০-৮-০, শুভাগত ৪-০-২৫-০, রকিবুল ১৩-০-৬২-১)
ময়মনসিংহ ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৩৭৩) ৬৪ ওভারে ১৮৯/৪ (মাহফিজুল ৬৮, খালিদ ১২, আরিফুল ১০, মজিদ ৩৯, আলআমিন ৫৫*, রিজান ১*, শাহরিয়া ৭-০-৩৬-১, ইকবাল ১১-৩-২৭-১, হাশিম ১৮-৩-৩৭-০, মামুন ৪-০-১৩-১, স্বাধীন ১৭-২-৫৩-০, রিজওয়ান ৬-১-১৯-১, অনিক ১-০-২-০)
ফল: ম্যাচ ড্র
ম্যান অব দা ম্যাচ: মিম মোসাদ্দেক
আশরাফুল-আশিকুরের সেঞ্চুরি
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে রান উৎসবের ঢাকা-সিলেট ম্যাচের শেষ দিনেও দেখা মিলেছে দুটি সেঞ্চুরির। দিনের শুরুতে কাঙ্ক্ষিত মাইলফলক স্পর্শ করেন সিলেটের আশরাফুল হাসান। পরে তিন অঙ্কের স্বাদ পান ঢাকার আশিকুর রহমান।
ব্যাটসম্যানদের দাপটে ড্র হওয়া ম্যাচে সেঞ্চুরি দেখা গেছে মোট পাঁচটি। এছাড়া ফিফটি হয়েছে আরও ছয়টি।
ম্যাচের শেষ দিরে ২০.১ ওভারে ৬৭ রান যোগ করতে বাকি ৫ উইকেট হারায় সিলেট। এর মাঝেই সাত ম্যাচের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রুপ দেন আশরাফুল। শেষ পর্যন্ত ১৭ চারে ২৫৯ বলে ১২২ রান করেন তিনি।
পেস বোলিং অলরাউন্ডার তোফায়েল আহমেদ আউট হন ৭৩ রান করে। প্রথম ইনিংসে ঢাকা পায় ৫১ রানের লিড।
২৯ ম্যাচের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে প্রথমবার ৫ উইকেটের স্বাদ পান লেগ স্পিনার আমিনুল ইসলাম।
দ্বিতীয় ইনিংসে প্রথম ওভারেই ঢাকার দুই ওপেনারকে ফিরিয়ে দেন ইকবাল হোসেন। এরপর আমিনুলও দ্রুত ফিরলে চাপে পড়ে যায় ঢাকা। তবে বিপদ বাড়তে দেননি আশিকুর। একপ্রান্ত আগলে রাখা তরুণ ব্যাটসম্যানকে কিছুক্ষণ সঙ্গ দেন মার্শাল আইয়ুব ও মাহিদুল ইসলাম।
পরে ষষ্ঠ উইকেটে ৭৭ রানের জুটি গড়েন আশিকুর ও তাইবুর। ফিফটি করেই ফিরে যান তাইবুর। আর আশিকুরের সেঞ্চুরি হতেই ইনিংস ঘোষণা করে দেয় ঢাকা।
১৭ ম্যাচের ক্যারিয়ারে ৪টি সেঞ্চুরি হয়ে গেল আশিকুরের। ১০১ রানের অপরাজিত ইনিংসের সৌজন্যে ১ হাজার রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন ২১ ছুঁইছুঁই টপ-অর্ডার ব্যাটার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ঢাকা ১ম ইনিংস: ৫৪৭/৬ডি.
সিলেট ১ম ইনিংস: (আগের দিন ৪২৯/৫) ১৪৯.১ ওভারে ৪৯৬ (আশরাফুল ১২২, তোফায়েল ৭৩, নাসুম ৭, নাঈম ০, ইকবাল ০, অনিক ০*, সুমন ১৯-৬-৫৬-০, রিপন ১৯-২-৮৪-২, এনামুল ১৪-০-৪৭-১, আরিফ ৪৪-৪-১২৬-১, আমিনুল ২৬.১-০-১০৮-৫, তাইবুর ১৯-৫-৩৫-১, জিসান ৩-০-১৬-০, মার্শাল ১-০-৯-০, আশিকুর ২-০-৭-০, নাঈম ১-০-১-০, মাহিদুল ১-০-৬-০)
ঢাকা ২য় ইনিংস: ৬১.১ ওভারে ২১৯/৬ডি. (নাঈম ০, জিসান ০, আশিকুর ১০১*, আমিনুল ১০, মার্শাল ৩২, মাহিদুল ১৫, তাইবুর ৫০, রিপন ০*; ইকবাল ৩-০-২০-২, নাসুম ২৬-৩-৭০-২, অনিক ৪-০-১৩-১, নাঈম ১৬.১-২-৪৮-১, গালিব ৯-০-২৮-০, জাকির ৩-০-২৯-০)
সিলেট ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ২৭১) ২ ওভারে ২/১ (মুবিন ০, নাসুম ০*, তোফায়েল ১*; রিপন ১-০-২-১, এনামুল ১-১-০-০)
ফল: ম্যাচ ড্র
ম্যান অব দা ম্যাচ: মার্শাল আইয়ুব
