এম.এ রাশেদ,বগুড়া জেলা প্রতিনিধিঃ
বগুড়ার ধুনটে কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং পরে ভিজিটর ভিসায় বিদেশে পাঠিয়ে বিপাকে ফেলার অভিযোগে দায়ের করা মানব পাচার মামলায় এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম মো. বোরহান উদ্দিন ওরফে বেলায়েত হোসেন (২৬)। তিনি ধুনট উপজেলার নাংলু দক্ষিণপাড়া গ্রামের মো. ছাইফুল ইসলাম প্রাংয়ের ছেলে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১২ অক্টোবর ২০২৬ বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে বগুড়ার গাবতলী থানাধীন বাগবাড়ী বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে যথাযথ পুলিশ পাহারায় তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, ধুনট থানায় দায়ের করা মামলা নম্বর ২১, তারিখ ২৬ আগস্ট ২০২৬। মামলাটির জিআর নম্বর ১৫৮/২৬। এতে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর ৭, ৮ ও ২২ ধারার উল্লেখ রয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, বাদী মো. রকি বাবুর সঙ্গে বোরহান উদ্দিনের পরিচয় হয় এজাহারভুক্ত অপর এক আসামির মাধ্যমে। বোরহান দীর্ঘদিন কম্বোডিয়ায় অবস্থান করার পর ২০২৪ সালে দেশে ফেরেন। এরপর পরিচয়ের সূত্র ধরে বাদীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বাদীকে কম্বোডিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণের কাজে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এ জন্য পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। বিনিময়ে বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া, মাসিক দেড় লাখ টাকা বেতন এবং বৈধ ওয়ার্কিং ভিসার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশে পৌঁছানোর পরদিন থেকেই কাজে যোগ দিতে পারবেন—এমন প্রতিশ্রুতিতে বাদী ও তাঁর পরিবার রাজি হন। ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় তাঁর বাবা ঋণ করে এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে কয়েক দফায় টাকা সংগ্রহ করেন বলে মামলার এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দুই লাখ টাকা, ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি আরও এক লাখ টাকা এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি অবশিষ্ট দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব টাকা আসামিদের একজনের হাতে নগদে তুলে দেন বাদী।
পরে ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা থেকে কম্বোডিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেন রকি বাবু। পরদিন সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁকে একটি মাইক্রোবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে আটকে রেখে তাঁর কাছে আরও এক লাখ টাকা দাবি, শারীরিক নির্যাতন এবং হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।
মামলার বিবরণে বলা হয়, বাদী বাংলাদেশে তাঁর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করলে পরিবারের পক্ষ থেকে আরও এক লাখ টাকা পাঠানো হয়। এরপর তাঁকে অন্য একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরও ১০ থেকে ১৫ জন ভুক্তভোগীর দেখা পান তিনি। তাঁদের কাছ থেকে জানতে পারেন, চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় ওয়ার্কিং ভিসার পরিবর্তে তাঁকেও মাত্র এক মাসের ভিজিটর ভিসা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এজাহারে আরও দাবি করা হয়, পরবর্তী সময়ে বাদীর পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তাঁকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন এবং পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন পর তাঁকে একটি অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে আরও চার লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে ওই স্থান থেকে পালিয়ে যান বাদী। পরে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ইমিগ্রেশন পুলিশের ভয়ে আত্মগোপনে দিন কাটাতে হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন তিনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ মার্চ এক বাংলাদেশি নাগরিকের ফোন ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন রকি বাবু। ছেলের বিপদের খবর পেয়ে তাঁর বাবা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ জানান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে স্থানীয় লোকজন ও গ্রামবাসীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ২ এপ্রিল ওই টাকা এক আসামির হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এরপর ৫ এপ্রিল দেশে ফেরেন রকি বাবু।
দেশে ফেরার পর বিষয়টি মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে একাধিক সালিশ-বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বৈঠকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে বাদীপক্ষের দাবি। সর্বশেষ ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত সালিশেও অভিযুক্তরা উপস্থিত হননি বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে মামলার এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতনামা অন্য আসামিদের যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে। তিনি জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হয়ে তদন্তকাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পুলিশ। এ কারণে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ধুনট থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আব্দুস শুকুর আলী জানান, মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং মামলার তদন্তে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
