নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
মণ্ডা মিঠাই
জAI দুর্গা
অভীক চ্যাটার্জি
২০ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
পেঁজা মেঘে রং ধরিয়ে, কাস ফুলে ঢেউ খেলিয়ে দোর গোড়ায় বাঙালির সেরা উৎসব। কোথাও ধূপের গন্ধে, কোথাও বা ঢাকের বোলে স্বাগত জানিয়েছে সবাই। কিন্তু, এই বছরের পুজোর এক আলাদা অংশ হয়ে হাতে হাত মিলিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আর সেখানেই লেগেছে গণ্ডগোল!
শাস্ত্রমতে দেবী সিংহবাহিনীর হাতের সংখ্যা দশ।ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি—দশভুজা দুর্গা, দশ হাতে দশ অস্ত্র, মহিষাসুরের সর্বনাশ। ব্যাপারটা মোটামুটি পরিষ্কার।কিন্তু AI-এর কাছে ব্যাপারটা মোটেই পরিষ্কার নয়। এবং এ বিষয়টা AI - কে বোঝানো বড্ড কঠিন, কারণ দেবী দুর্গার দশভুজা পরিচয়টা AI মোটামুটি “suggestion” হিসেবে নিয়েছে, instruction হিসেবে নয়। আর তাই, দেবীর হাতের সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সংখ্যাতত্ত্বের ভাষায় কনস্ট্যান্ট নয়, পুরোটাই ভ্যারিয়েবল।
বাঙালী চিরকালই সৃজনশীল জাত। ঢাক শাঁখ ধূপ ধুনো কাশফুল মায় শাড়ি পরা এসথেটিক সুন্দরী, সব মিলিয়ে হোডিং কিংবা পোস্টার বানানোয় তার জুড়ি মেলা ভার, কিন্তু সব দেখতে গিয়ে অন্ধকারটা জমাট বেঁধেছে ঠিক পিলসুজের নিচেই। সম্প্রতি AI দিয়ে তৈরি দুর্গার পোস্টার দেখতে দেখতে মনে হচ্ছে, দেবী যেন নিজেই নিজের হাতের হিসেব ভুলে গেছেন। কোনও ছবিতে ছয় হাত। কোনওটায় আট। কোথাও দশ—বাহ, অবশেষে ঠিকঠাক! আবার পরের ছবিতেই বারো। একটু ভালো করে দেখলে কোথাও চৌদ্দ। বারো হাত তো আকছার দেখা যাচ্ছে, পেছনে দশ হাত আর সামনের দুটো দিয়ে অসুর নিধনে ব্রতি হয়েছেন বিন্ধ্যবাসিনী। মনে হয়, দেবী এবার শুধু মহিষাসুর বধ করছেন না, AI-এর গণিতও বধ করছেন। আর AI-র হাতের আর একটা মজার ব্যাপার আছে। হাতের সংখ্যা ঠিক থাকলেও, হাতের মালিক কে—সেটা সবসময় পরিষ্কার নয়।একটা হাত কোথা থেকে বেরিয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। আরেকটা হাত হয়তো সিংহের পেছনে আত্মগোপন করেছে। কোনও হাতের কবজি আছে, কিন্তু বাহু নেই। কোনও বাহু আছে, কিন্তু হাত নেই। কখনও আবার একই হাতের মধ্যে দুটো আঙুল এমনভাবে জুড়ে যায় যে মনে হয় দেবী এবার থেকে মুদ্রাবিদ্যার নতুন শাখা চালু করবেন।
অবশ্য AI-কে খুব বেশি দোষও দেওয়া যায় না।সে তো আমাদের মতো পুজোর মাঠে বড় হয়নি। সে কুমোরটুলির গলি দিয়ে হেঁটে প্রতিমার কাঠামো দেখেনি। বিসর্জনের আগে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মন খারাপ করেনি। সে জানে ‘দশভুজা’ শব্দটি। কিন্তু দশভুজা দেখার অভিজ্ঞতা আর দশভুজা বোঝার মধ্যে যে একটা বিশাল ফারাক আছে, আর সেখানেই বেঁধেছে গোল। তাই AI-কে যদি বলা হয়, “একটা সুন্দর দুর্গাপুজোর পোস্টার বানাও”, সে তার সমস্ত সৃজনশীলতা নিয়ে হাজির হয়। সঙ্গে থাকে কুয়াশা, ধূপ, ঢাক, পদ্ম, সোনালি আলো, মেঘ, সিংহ, মহিষাসুর—আর অতিরিক্ত কয়েক জোড়া হাত।তবে একটা কথা মানতেই হবে—এই ভুলগুলোর মধ্যেও একটা মায়া আছে। কারণ AI যতই নিখুঁত ছবি বানানোর দাবি করুক, মায়ের হাত গুনতে গিয়ে তার বারবার ভুল করে যাওয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেবী আসলে শুধু একটি নিখুঁত ডিজিটাল অবয়ব নন।দশটি হাতের প্রতিটা হাতের একটা অর্থ আছে। প্রতিটি অস্ত্রের একটা গল্প আছে। আর সেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শতাব্দীর বিশ্বাস, শিল্প আর স্মৃতি।
তাই আগামী বছর কোনও AI-কে দিয়ে দুর্গার পোস্টার বানালে হয়তো prompt-এর শেষে লিখে দেওয়াই ভালো—
“মা দুর্গার দশটি হাত। দশটি। ঠিক দশটি।
দয়া করে অযথা গণিতে সৃজনশীল হবেন না।”
নাহলে একদিকে স্বর্গে যেমন অস্ত্রের রিটার্ন প্রোডাক্টের হিড়িক পড়ে যাবে, অন্যদিকে আকাল পড়বে অস্ত্রের। তখন এই পিঠ বাঁচানো বাঙালির দুর্ভোগের আর সীমা থাকবে না!
